আইনের রক্ষকরাই এখন ঝুঁকিতে: পুলিশ সদস্যদের ওপর ধারাবাহিক হামলায় উদ্বেগ বাড়ছে
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
৩১ জুলাই ২০২৬
দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার ধারাবাহিকতায় স্পষ্ট হচ্ছে—আইন প্রয়োগকারীরাই এখন নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ছেন, যা সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি অশনি সংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ২২ জুলাই রাত আনুমানিক ৯টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিং এলাকায় স্ত্রী ও সন্তানসহ বাসায় ফেরার পথে উপপরিদর্শক (এসআই) ওসমান গনিকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় ক্লিনিক এবং পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার পিঠে ৪৫টি সেলাই দিতে হয়েছে। তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে বিশেষ শাখায় কর্মরত।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ২৬ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগে হামলার দিন সকালে অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি তার সঙ্গে পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগ করেছিল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের আমবাগান এলাকায় মাদক মামলার এক আসামিকে ধরতে গিয়ে ডবলমুরিং থানার এসআই মবিনুল ইসলাম দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হন। তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে গিয়ে তিন পুলিশ সদস্য কুপিয়ে আহত হন। অন্য এক ঘটনায় নারী আসামি গ্রেফতারের সময় হামলার শিকার হয়ে আহত হন ছয়জন পুলিশ সদস্য। রাজধানীর আদাবর এলাকাতেও ছিনতাইকারীদের আস্তানায় অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৩১৭ জন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৪২, ফেব্রুয়ারিতে ৪২, মার্চে ৬৩, এপ্রিলে ৬৬, মে মাসে ৫৫ এবং জুনে ৪৯ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো—২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৩৮১ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালেই এ সংখ্যা ছিল ৬০১।
এদিকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে বলে জানা গেছে, যা দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান বলেন, “পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার বিচার হচ্ছে না। ফলে পুলিশের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে এবং তারা অনেক সময় নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিতে বাধ্য হচ্ছে।”
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, পুলিশের প্রতি আগের তুলনায় আস্থাহীনতা কমেছে এবং বাহিনী এখন সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। তবে অপরাধীদের সাহস বেড়ে যাওয়ায় অভিযান পরিচালনায় অতিরিক্ত সতর্কতা ও প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা
ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “আইন প্রয়োগকারীদের ওপর হামলা মানে আইনের শাসনের ওপর আঘাত। জনগণের আস্থা কমে গেলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তে পারে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সীমিত বলপ্রয়োগের কারণে অনেক সময় পুলিশ সদস্যরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। তবে প্রতিটি হামলার ঘটনায় মামলা নেওয়া হচ্ছে এবং জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পুলিশের নিরপেক্ষতা, জবাবদিহিতা ও পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন না করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।