আখেরি চাহার সোম্বা: ইসলামী শরিয়তে এর অবস্থান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
অনলাইন ডেস্ক | আদালত বার্তাঃ১২ আগষ্ট ২০২৬
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬
সফর মাসের শেষ বুধবার মুসলিম সমাজে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ নামে পরিচিত। ফারসি শব্দ ‘আখেরি চাহার সোম্বা’র অর্থ ‘শেষ বুধবার’। বাংলাদেশে প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতিতে দিনটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে দোয়া, মিলাদ, ওয়াজ-মাহফিল ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
আখেরি চাহার সোম্বার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ দিকে সফর মাসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অসুস্থতার শেষ পর্যায়ে এক বুধবার তিনি কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন—এমন একটি বর্ণনা উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। সেই ঘটনাকে স্মরণ করে অনেকে দিনটিকে শুকরিয়া ও নফল ইবাদতের দিন হিসেবে পালন করে থাকেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার বিভিন্ন ঘটনা সহিহ হাদিসে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হলেও ‘সফর মাসের শেষ বুধবার’কে বিশেষ ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালন করার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায় না। তাঁর অসুস্থতার দিন-তারিখ নিয়েও আলেমদের মধ্যে ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে।
শরিয়তের দৃষ্টিতে দিনটির বিশেষ মর্যাদা আছে কি?
ইসলামী শরিয়তে কোনো দিনকে বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে নির্ধারণ করতে হলে কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। এ কারণে অনেক আলেমের মতে, আখেরি চাহার সোম্বাকে ঈদ, ফরজ ইবাদতের বিশেষ দিন বা শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত পুণ্যময় দিবস মনে করা সঠিক নয়।
অর্থাৎ, এ দিনকে কেন্দ্র করে এমন কোনো ইবাদতকে আবশ্যিক বা বিশেষ সওয়াবের আমল হিসেবে বিশ্বাস করা উচিত নয়, যার নির্দিষ্ট শরিয়তি প্রমাণ নেই।
তবে সাধারণভাবে দোয়া করা, নফল নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দরুদ পাঠ, সদকা করা এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা ইসলামে বৈধ ও সওয়াবের কাজ। এগুলো বছরের যেকোনো দিনই করা যায়। কিন্তু শুধু আখেরি চাহার সোম্বার জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ পদ্ধতি বা বিশেষ ফজিলত শরিয়তসম্মত বলে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
নবীজি (সা.)-এর শেষ অসুস্থতা
সহিহ হাদিসের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা পাওয়া যায়। তিনি অসুস্থ অবস্থায় সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে ছিলেন এবং তাঁর শেষ জীবনের ইবাদত, নামাজ ও উম্মতের প্রতি দিকনির্দেশনা হাদিসে সংরক্ষিত হয়েছে।
বিশেষভাবে তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় হযরত আবু বকর (রা.)-কে নামাজের ইমামতি করার নির্দেশ দেওয়ার ঘটনা সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ফলে আখেরি চাহার সোম্বার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রচলিত কাহিনির পাশাপাশি সহিহ হাদিসে প্রমাণিত ঘটনাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া ইসলামী জ্ঞানচর্চার মৌলিক নীতি।
তাহলে কীভাবে দিনটি পালন করা যেতে পারে?
আখেরি চাহার সোম্বাকে কেন্দ্র করে কোনো কুসংস্কার, অপচয় বা শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডে না গিয়ে একজন মুসলমান চাইলে দিনটিকে অন্যান্য দিনের মতোই ইবাদত-বন্দেগি ও নেক আমলে কাটাতে পারেন।
বিশেষ করে—
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা;
কোরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা;
বেশি বেশি দরুদ ও জিকির করা;
নিজের, পরিবার ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা;
অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সহযোগিতা করা;
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।
এসব আমলের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বুধবারের ওপর নির্ভর করতে হয় না; বরং এগুলো একজন মুমিনের নিয়মিত জীবনযাপনের অংশ হওয়া উচিত।
ছুটির বিষয়টি
সরকারি ছুটির তালিকা অনুযায়ী, ১২ আগস্ট ২০২৬, বুধবার আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি রয়েছে। তবে সরকারি ছুটি থাকা এবং কোনো দিনকে শরিয়তের দৃষ্টিতে বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ইসলামের মূল শিক্ষা
আখেরি চাহার সোম্বাকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কোনো নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নবীজি (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণই একজন মুসলমানের জন্য প্রকৃত
শিক্ষা।
সুতরাং, দিনটিকে ঘিরে প্রচলিত ঐতিহ্য ও সামাজিক আয়োজন থাকলেও শরিয়তসম্মত আমল ও সহিহ হাদিসের নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। ধর্মীয় কোনো আমলকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার আগে তার পক্ষে কোরআন ও নির্ভরযোগ্য সুন্নাহর দলিল রয়েছে কি না—তা যাচাই করাই ইসলামের জ্ঞানভিত্তিক চর্চার দাবি।
আদালত বার্তার পক্ষ থেকে পাঠকদের প্রতি আহ্বান—ধর্মীয় বিষয়ে আবেগের পাশাপাশি সহিহ জ্ঞান, কোরআন-সুন্নাহর দলিল এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করুন।