আদালত বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তাঃ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশের অন্যতম বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার আইনি লড়াই এবার চূড়ান্ত পরিণতির দ্বারপ্রান্তে। গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এই মামলার আপিল শুনানি সমাপ্ত হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি যেকোনো দিন রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (C.A.V) রয়েছে। প্রায় ২২ বছর ধরে চলা এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম, সাজা পরিবর্তন এবং এর সাথে জড়িত আইনি প্রশ্নগুলো দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম. এ. মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এক জনসভা চলাকালে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী প্রকাশ্য দিবালোকে ব্রাশফায়ার করে। এতে বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা, প্রখ্যাত শ্রমিকনেতা এবং তৎকালীন সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার নির্মমভাবে নিহত হন। একই ঘটনায় ওমর ফারুক রতন নামের আরেকজন নিহত হন এবং আরও অনেকেই আহত হন। এই হত্যাকাণ্ড সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এই মামলার অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের রায়ের মধ্যকার সুস্পষ্ট পার্থক্য।
হাইকোর্টে আসামিদের সাজা কমানো ও খালাস পাওয়ার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি মূলনীতি কাজ করেছে, যা বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচার্য বিষয়। এই মামলার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত আইনগত বিষয়গুলো (Questions of Law) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
১. দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারা এবং 'Common Intention' (সাধারণ অভিপ্রায়):
হত্যার অভিযোগ (৩০২ ধারা) প্রমাণের পাশাপাশি আসামিদের মধ্যে 'সাধারণ অভিপ্রায়' (৩৪ ধারা) ছিল কি না, তা প্রমাণ করা রাষ্ট্রপক্ষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা এবং অপরাধ সংঘটনে পূর্বপরিকল্পিত অংশগ্রহণ প্রমাণ ছাড়া কেবল উপস্থিতির কারণে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় কি না, তা এই মামলার অন্যতম বিচার্য বিষয়।
২. চাক্ষুষ বনাম ডাক্তারি সাক্ষ্য (Ocular vs. Medical Evidence):
ফৌজদারি মামলার প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য (Ocular evidence) এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের (Medical evidence) মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হয়। কে কোন দিক থেকে গুলি করেছে, শরীরে গুলির আঘাতের স্থান এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার মধ্যে কোনো মৌলিক অসামঞ্জস্যতা (Inconsistency) রয়েছে কি না, তা আসামিদের দায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
৩. সাক্ষ্যের অসামঞ্জস্যতা ও বিলম্বিত সাক্ষ্য (Contradiction/Omission & Delayed Evidence):
সাক্ষীদের জেরা করার সময় তাদের জবানবন্দি এবং পুলিশের কাছে দেওয়া পূর্ববর্তী বিবৃতির (১৬১ ধারার জবানবন্দি) মধ্যে কোনো বৈপরীত্য (Contradiction) বা বাদ পড়া অংশ (Omission) আসামিপক্ষকে সুবিধা দেয়। এছাড়া, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার পরও সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটে থাকলে তা সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতাকে (Evidentiary value) দুর্বল করে দেয়।
৪. স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মূল্যায়ন (Confession/Statement):
আসামিদের কেউ ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে থাকলে তা স্বেচ্ছায় প্রদত্ত (Voluntary) এবং সত্য (True) ছিল কি না, তা আদালতকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সহ-আসামির স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে অন্য আসামিকে সাজা দেওয়ার আইনি সীমাবদ্ধতাগুলোও হাইকোর্টের রায়ে প্রতিফলিত হয়েছে।
৫. আপিল আদালত কর্তৃক সাক্ষ্যের পুনর্মূল্যায়ন (Re-evaluation of Evidence):
বিচারিক আদালত সাধারণত পারিপার্শ্বিক অবস্থার চেয়ে আবেগের বশবর্তী হয়ে বা ঘটনার ভয়াবহতা দেখে অনেক সময় সর্বোচ্চ সাজা দিয়ে থাকেন। কিন্তু একটি আপিল আদালত হিসেবে হাইকোর্ট এবং বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ প্রতিটি সাক্ষ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনর্মূল্যায়ন (Re-appreciation of evidence) করার আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করেছেন।
বিচারিক আদালতে যেখানে ২২ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল, সেখানে হাইকোর্টে মাত্র ৬ জনের ফাঁসি বহাল থাকা প্রমাণ করে যে, ফৌজদারি বিচারে "সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ" (Proof beyond reasonable doubt) নীতির প্রয়োগ কতটা কঠোর হতে পারে।
আগামী দিনগুলোতে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার অবসান ঘটবে বলে আশা করা যাচ্ছে। দেশের আইন অঙ্গন এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে—চূড়ান্ত রায়ে হাইকোর্টের সিদ্ধান্তই বহাল থাকবে, নাকি সাক্ষ্য-প্রমাণের নতুন কোনো আইনি ব্যাখ্যার উন্মোচন ঘটবে?