‘ক্রসফায়ার’ বন্ধ, অপরাধ দমনে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ডিটেনশনের প্রস্তাব পুলিশের
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তা:৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একসময় অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর ব্যবহার থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ক্রসফায়ারের ভীতি না থাকায় অপরাধীরা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পাশাপাশি আইনি ফাঁকফোকর গলে সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধ দমনে প্রয়োজনে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে অপরাধীদের ডিটেনশনে (আটকাদেশ) নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের ‘মর্নিং মিটিং’ এবং মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় (ক্রাইম কনফারেন্স) এসব বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির।
আইনি সীমাবদ্ধতায় জামিন ও ডিটেনশনের প্রস্তাব
সভায় অপরাধীদের দ্রুত জামিন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কর্মকর্তারা। রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান জানান, বিচারপ্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আসামিরা সহজেই জামিন পাচ্ছে। বিশেষ করে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে না পারলে আসামির জামিনের অধিকার তৈরি হয়।
এই সুযোগ রোধে এবং বর্তমানে ‘ক্রসফায়ার’ বন্ধ থাকায় অপরাধীদের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে ডিটেনশনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইনও ডিটেনশনকে একটি কার্যকর পদ্ধতি বলে একমত পোষণ করেন। তবে ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান ঢালাওভাবে আটক না করে অপরাধীদের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট ডেটাবেজ তৈরি করে আইনি প্রক্রিয়ায় ডিটেনশন দেওয়ার পরামর্শ দেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণে ডিএনসি-তে অতিরিক্ত আইজিপি নিয়োগের প্রস্তাব
সভায় অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মাদককে চিহ্নিত করা হয়। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, মাদক কেনাবেচা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং এটিই বেশিরভাগ অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে (ডিএনসি) পুলিশের প্রত্যক্ষ কমান্ডে আনার প্রস্তাব করা হয়। প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন কর্মকর্তারা।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও জনআস্থা ফেরানোর তাগিদ
জনগণের আস্থা ফেরাতে পুলিশকে আরও সেবামুখী হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। এক অতিরিক্ত আইজিপি জানান, প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার সদস্যের এই বিশাল বাহিনীর মধ্যে নানা গুঞ্জন ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। এই কনফিউশন দূর করে গোটা পুলিশ বাহিনীকে ‘স্ট্রিমলাইনিং’ বা সুসংগঠিত করা জরুরি। শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব দিয়ে নয়, সরাসরি জনসংযোগ বাড়িয়ে জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে।
আলোচনায় সাম্প্রতিক আলোচিত অপরাধ
সভায় সম্প্রতি ঘটা বেশ কয়েকটি অপরাধমূলক ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে রাড্ডা ম্যাটার্নাল সেন্টারে হামলা, মোহাম্মদপুরে জমি দখলে সশস্ত্র মব হামলা, শীর্ষ মাদক কারবারি ‘পিচ্চি রাজা’র প্রিজনভ্যান থেকে পলায়ন, চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত খুন এবং মিরপুরে বাসে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়।
অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই: আইজিপি
মর্নিং মিটিং শেষে মাসিক ক্রাইম কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে অপরাধীর দলীয় পরিচয় বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই; তার একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী।
সভায় কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের উদ্ঘাটন করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন অতিরিক্ত আইজি সাইদুর রহমান। এছাড়া জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের যথাযথভাবে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।