
ইফতেমাম হক, ল এন্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি করসপন্ডেন্ট, আদালত বার্তাঃ৩ অক্টোবর ২০২৬
সফলতার অন্যতম ভিত্তি পরিশ্রম। তবে দীর্ঘ সময় কাজ করলেই আর্থিক সচ্ছলতা আসে না। কেউ ১০–১২ ঘণ্টা কাজ করেও পিছিয়ে থাকেন, আবার কেউ কম সময় কাজ করে বেশি আয় করেন। এর পেছনে জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজারচাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা গড়ে তোলার ভূমিকা রয়েছে।
AI, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মসংস্থানের ধরন বদলে দিচ্ছে। তাই শুধু কর্মঘণ্টা বাড়ানোর বদলে দক্ষতা ও পরিশ্রমের সমন্বয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। যে ব্যক্তি প্রযুক্তি আয়ত্ত করে বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারেন, তাঁর অর্থনৈতিক মূল্যও বাড়ে।
নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা মাসিক বেতনের ওপর নির্ভরশীল আয়ে স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা থাকে। মানুষ দিনের নির্দিষ্ট সময়ের বেশি কাজ করতে পারেন না। কিন্তু বিশেষায়িত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান বাজারমূল্য বাড়ায়।
একজন সাধারণ কর্মী নির্ধারিত পারিশ্রমিক পেলেও দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান জটিল সমস্যার সমাধানে বেশি আয় করতে পারেন। সফটওয়্যার ডেভেলপার একটি সমাধান বহু গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। উদ্যোক্তা দক্ষতা, পুঁজি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা কাজে লাগিয়ে নিজের উপস্থিতির বাইরে চলা ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন।
এটাই শ্রমের সময় ও অর্থনৈতিক মূল্যের পার্থক্য। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা মানুষের ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বাড়ায়। তবে বেশি চাহিদাসম্পন্ন, জটিল ও তুলনামূলক বিরল দক্ষতার পারিশ্রমিক সাধারণত বেশি হয়।
ধরা যাক, পৃথিবীর সব সম্পদ সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হলো। পাঁচ–আট বছর পরও কি সবাই সমান সম্পদের মালিক থাকবেন? এর কোনো সর্বজনীন উত্তর নেই। কারণ মানুষের সিদ্ধান্ত, ভোগ, সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ঝুঁকি গ্রহণ, দক্ষতা এবং সুযোগের পার্থক্যে সম্পদের মালিকানা বদলাতে পারে।
কেউ সম্পদ ভোগে ব্যয় করবেন, কেউ শিক্ষা বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন; কেউ লাভবান হবেন, কেউ লোকসানে পড়বেন। রাষ্ট্রীয় নীতি, করব্যবস্থা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার, বাজার ও সামাজিক নিরাপত্তাও ফলাফল নির্ধারণ করবে।
মূল শিক্ষা হলো—সম্পদের মালিক হওয়া এবং তা উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তরের সক্ষমতা এক নয়। তাই ন্যায্য বণ্টনের পাশাপাশি শিক্ষা, প্রযুক্তি, পুঁজি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিলিয়নিয়ার হওয়ার নিশ্চিত সূত্র নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ গড়তে পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো, আয়ের অংশ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করা, শ্রমের পাশাপাশি পণ্য-সেবা বা ব্যবসায়িক ব্যবস্থা তৈরি করা এবং প্রযুক্তি ও মূলধন কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ।
চক্রবৃদ্ধি মুনাফাও সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়ক। এর সূত্র:
A = P(1+r)ⁿ
এখানে P প্রাথমিক বিনিয়োগ, r মুনাফার হার এবং n মেয়াদ। এক লাখ টাকা বার্ষিক ১০ শতাংশ হারে ১০ বছর বিনিয়োগ করলে, অতিরিক্ত অর্থ না জমা দিয়ে, তা প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার টাকায় দাঁড়াতে পারে। এটি কেবল গাণিতিক উদাহরণ; বাস্তবে লোকসান, মূল্যস্ফীতি, কর ও ব্যয় বিবেচনা করতে হয়।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের Future of Jobs Report 2025 অনুযায়ী, ২০২৫–২০৩০ সময়ে বিশ্বে ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ৯ কোটি ২০ লাখ কর্মসংস্থান বিলুপ্ত বা স্থানচ্যুত হতে পারে। নিট কর্মসংস্থান বাড়তে পারে ৭ কোটি ৮০ লাখ। একই সময়ে বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার প্রায় ৩৯ শতাংশ বদলে যেতে পারে।
চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতার মধ্যে রয়েছে—
১. AI ও ডেটা অ্যানালিটিক্স: তথ্য বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রযুক্তিনির্ভর সমস্যা সমাধান।
২. সাইবার নিরাপত্তা: তথ্য, নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষা।
৩. ডিজিটাল কনটেন্ট ও সৃজনশীলতা: গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও সম্পাদনা, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ওয়েব ডেভেলপমেন্ট।
৪. কারিগরি দক্ষতা: ইলেকট্রিক্যাল কাজ, মেশিন পরিচালনা, অটোমেশন, রোবোটিকস, গাড়ি মেরামত ও রেফ্রিজারেশন।
৫. ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা: নেতৃত্ব, যোগাযোগ, দর-কষাকষি, গ্রাহক ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা দক্ষতা।
৬. বিশ্লেষণী চিন্তা: তথ্য যাচাই, যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত ও সৃজনশীল সমস্যা সমাধান।
প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচারবোধ ও দায়িত্বশীলতার গুরুত্বও বাড়বে।
ILO ও পোল্যান্ডের National Research Institute-এর ২০২৫ সালের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি চারজন কর্মীর একজন এমন পেশায় আছেন, যেখানে জেনারেটিভ AI-এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত না হয়ে কাজের ধরন বদলানোর সম্ভাবনাই বেশি।
হিসাবরক্ষক AI দিয়ে তথ্য বিশ্লেষণ দ্রুত করতে পারেন, সাংবাদিক প্রাথমিক তথ্য সাজাতে পারেন এবং আইনজীবী নথি বিশ্লেষণ করতে পারেন। কিন্তু তথ্য যাচাই, অনুসন্ধান, পেশাগত বিচার ও মানুষের স্বার্থ মূল্যায়নে মানবিক দক্ষতা অপরিহার্য।
তাই AI-কে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শেখা দরকার। তবে AI-উৎপাদিত তথ্য যাচাই ছাড়া ব্যবহার করলে ভুল ও পেশাগত ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য কারিগরি দক্ষতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাগত সনদ থাকলেও বাস্তব কাজ, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও বাজারচাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কর্মবাজারের সংযোগ বাড়াতে হবে এবং কারিগরি শিক্ষাকে মর্যাদা দিতে হবে। দক্ষ টেকনিশিয়ান, ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক, ওয়েল্ডার, প্লাম্বার, রেফ্রিজারেশন বিশেষজ্ঞ ও শিল্পকর্মীরা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
একই সঙ্গে সফটওয়্যার, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরিতে মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তবে সবাইকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বা ফ্রিল্যান্সার হতে হবে না। কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ, পরিবহন, স্বাস্থ্য, আইন ও শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই দক্ষ মানুষের প্রয়োজন।
দক্ষতা সফলতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, কিন্তু একমাত্র শর্ত নয়। উপযুক্ত কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি, মূলধন বা বৈষম্যহীন পরিবেশ না থাকলে দক্ষ ব্যক্তিও পিছিয়ে পড়তে পারেন।
তাই প্রয়োজন—
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগদাতা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের যৌথ দায়িত্ব রয়েছে।
ভবিষ্যতের প্রধান সক্ষমতা হবে নিয়মিত শেখা, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাস্তব সমস্যার সমাধান করা। আজকের নতুন প্রযুক্তি দ্রুত সাধারণ হয়ে যেতে পারে; পেশার কাজের ধরনও বদলাতে পারে।
তাই তিনটি অভ্যাস জরুরি—
Learn: নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি শেখা।
Unlearn: অকার্যকর পুরোনো পদ্ধতি ত্যাগ করা।
Relearn: পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুনভাবে দক্ষতা অর্জন করা।
এর সঙ্গে সততা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ ও বিশ্লেষণী চিন্তাও প্রয়োজন।
নিজের আগ্রহ ও বাজারচাহিদা অনুযায়ী একটি দক্ষতা বেছে নিয়ে হাতে-কলমে শেখা, কাজের পোর্টফোলিও তৈরি, প্রযুক্তি ও AI ব্যবহার আয়ত্ত এবং নিয়মিত দক্ষতা মূল্যায়ন করা উচিত।
শুধু সার্টিফিকেট নয়, বাস্তবে কী কাজ করতে পারেন—সেটিই দক্ষতার প্রধান পরিচয়।
সফলতা শুধু বেশি সময় কাজের ফল নয়; জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে কতটা মূল্য সৃষ্টি করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা, মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও শ্রমের ন্যায্য মূল্য।
দক্ষতার সঙ্গে সততা, দায়িত্ববোধ ও পেশাগত নৈতিকতাও জরুরি। অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে অর্জিত সম্পদ প্রকৃত সফলতা নয়।
ভবিষ্যতে সফলতার নির্ধারক হবে কে দ্রুত শিখতে পারে, প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে এবং মানুষের প্রয়োজন পূরণে মূল্য সৃষ্টি করতে পারে।
তাই শ্রমের পরিমাণের পাশাপাশি গুণগত মান বাড়াতে হবে; চাকরির পেছনে ছোটা নয়, নিজেকে কর্মদক্ষ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। ভবিষ্যৎ তাঁদের জন্যই সম্ভাবনাময়, যাঁরা পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে শেখার মাধ্যমে প্রস্তুত হন।
তথ্যসূত্র:
১. World Economic Forum, The Future of Jobs Report 2025।
২. International Labour Organization (ILO), Generative AI and Jobs: A Refined Global Index of Occupational Exposure, 2025।
৩. World Economic Forum, Skills Outlook 2025।