জব্দকৃত পচনশীল খাদ্যশস্য থানায় ফেলে রেখে নষ্ট করার সুযোগ নেই: হাইকোর্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তা
ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মজুতদারির অভিযোগে জব্দ করা পচনশীল খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন থানার হেফাজতে ফেলে রেখে নষ্ট করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই বলে গুরুত্বপূর্ণ অভিমত দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আলামত হিসেবে প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ নমুনা সংরক্ষণ করে অবশিষ্ট খাদ্যশস্য দ্রুত আইনসম্মতভাবে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
নওগাঁয় মজুতদারির অভিযোগে জব্দ করা ২৫ মেট্রিক টন চালের জিম্মা সংক্রান্ত এক ফৌজদারি রিভিশনের রায়ে হাইকোর্ট এ পর্যবেক্ষণ দেন।
বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৯ আগস্ট এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় দেন। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মো. খায়রুল আলম।
এক বছরের বেশি সময় থানায় পড়ে ছিল ২৫ টন চাল
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মো. জাহিদুল ইসলামের বাড়ি থেকে ২৫ হাজার কেজি বা ২৫ মেট্রিক টন—৫০০ বস্তা কাটারি আতপ চাল জব্দ করা হয়। জব্দ করা চালের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ১৫ লাখ টাকা।
এর পরদিন, ৪ জুলাই বদলগাছী থানায় ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ৩(ঘ)/৪ ধারায় মো. শিবলু হোসেন ও মো. জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
পরবর্তীতে মামলাটি নওগাঁর তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বিচারার্থে স্থানান্তরিত হয়।
প্রকৃত মালিকানা নিয়ে জটিলতা
মামলার তদন্ত চলাকালে মো. শিবলু হোসেন জব্দ করা চালের প্রকৃত মালিক দাবি করে তা তাঁর জিম্মায় দেওয়ার আবেদন করেন। তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে শিবলু হোসেনকে জব্দ করা চালের প্রকৃত মালিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে ওই প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের ২২ জুলাই বিচারিক আদালত চালের জিম্মা চেয়ে করা আবেদনটি খারিজ করেন। পরবর্তীতে এ আদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিভিশন আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়।
এরপর ১৩ নভেম্বর শিবলু হোসেন পুনরায় জব্দ করা চালের জিম্মা চেয়ে আবেদন করেন। একই দিনে সেই আবেদনও খারিজ হলে তিনি হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন।
হাইকোর্ট ওই আবেদনের শুনানি নিয়ে রুল জারি করেন। পরবর্তীতে রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত তা যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন।
খাদ্যশস্য নষ্ট হওয়া রোধে আইনের বিধান বিশ্লেষণ
রায়ে হাইকোর্ট ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ১১ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করেন।
আদালত বলেন, এই আইনের অধীনে জব্দ করা খাদ্যশস্য পচনশীল কিংবা অপচনশীল—যাই হোক না কেন, মামলার আলামত হিসেবে যতটুকু প্রয়োজন, কেবল সেই পরিমাণ নমুনা সংরক্ষণ করা হবে। অবশিষ্ট খাদ্যশস্য দ্রুত প্রকাশ্যে নিলাম অথবা আইনসম্মত অন্য কোনো পদ্ধতিতে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
হাইকোর্ট আরও বলেন, দীর্ঘদিন পুলিশ হেফাজতে রেখে পচনশীল খাদ্যশস্য নষ্ট হয়ে গেলে তাতে রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তির কোনো কল্যাণ হয় না। বরং খাদ্যশস্য মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
‘থানায় রেখে কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না’
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, আলোচ্য মামলায় ২০২৫ সালের ৩ জুলাই চাল জব্দ করা হয়েছিল। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ ছাড়াই তা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে থানার হেফাজতে পড়ে রয়েছে।
এ অবস্থায় আদালত অভিমত দেন, দীর্ঘদিন পুলিশ হেফাজতে রাখার কারণে চাল নষ্ট হয়ে মানুষের ভোগের অনুপযোগী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এভাবে চাল থানায় রেখে কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
১৫ লাখ টাকার বন্ডে চাল হস্তান্তরের নির্দেশ
হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট সেশন আদালতকে নির্দেশ দিয়েছেন, জব্দ করা ২৫ টন চালের মধ্যে সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ নমুনা সংরক্ষণ করতে হবে। অবশিষ্ট চাল আবেদনকারী মো. শিবলু হোসেনের জিম্মায় হস্তান্তর করতে হবে।
তবে এজন্য তাঁকে ১৫ লাখ টাকার বন্ড/জামানত সম্পাদন করতে হবে।
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মামলার বিচার শেষে যদি মো. শিবলু হোসেনের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়, তাহলে ওই ১৫ লাখ টাকার বন্ডের অর্থ সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
অন্যদিকে, বিচার শেষে যদি তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত না হয়, তাহলে ওই বন্ড/জামানত বাতিল বলে গণ্য হবে এবং মালিকের অনুকূলে তা অবমুক্ত হবে।
আইন প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
আইন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত জব্দ করা পচনশীল খাদ্যশস্যের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মামলার আলামত সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা যেমন আদালত গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি আলামত সংরক্ষণের নামে মূল্যবান ও পচনশীল খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন নষ্ট হতে দেওয়ার বিরুদ্ধেও অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
অর্থাৎ, বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও আলামত সংরক্ষণের সঙ্গে খাদ্যশস্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে—হাইকোর্টের রায়ের মূল বক্তব্যে এ বিষয়টিই প্রতিফলিত হয়েছে।