দুজন স্থানীয় সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি: হাইকোর্ট
আদালত বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
ঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে খালাস দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, অন্তত দুজন স্থানীয় সম্মানিত বাসিন্দার উপস্থিতি ছাড়া তল্লাশি ও জব্দের কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছেন, তল্লাশির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওই সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত না করলে সেই তল্লাশি ও জব্দের কার্যক্রম ফৌজদারি বিচারে বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে।
এই যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ‘রত্না খাতুন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় অধস্তন আদালতের দেওয়া সাজা বাতিল করে আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ১৭ জুলাই বিচারপতি মো. সেলিমের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ ফৌজদারি রিভিশনের রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৪ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।
হাইকোর্টের যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার ১ ও ২ উপধারায় তল্লাশি ও জব্দের ক্ষেত্রে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতির যে বিধান রয়েছে, তা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্তত দুজন সম্মানিত বাসিন্দার উপস্থিতিতে তল্লাশি পরিচালনা করতে হবে। তল্লাশি ও জব্দের পুরো প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওই দুই স্থানীয় বাসিন্দার উপস্থিতিতে সম্পন্ন হতে হবে। তা
রা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তল্লাশি ও জব্দের কার্যক্রম শেষ করা হলে কিংবা তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর এসব কার্যক্রম পরিচালিত হলে আইনের শর্ত পূরণ হবে না এবং তা বেআইনি হিসেবে গণ্য হবে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও নিম্ন আদালতের রায়
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানার কাছারিপাড়া গ্রামে রত্না খাতুনের বাড়িতে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি দল। পরিদর্শক মো. ফারুক সুলতানের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে রত্না খাতুনকে আটক করে তার কাছ থেকে আনুমানিক তিন গ্রাম ওজনের ২৫ পুরিয়া হেরোইন উদ্ধারের দাবি করা হয়।
বিচার শেষে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার তৃতীয় আদালতের যুগ্ম দায়রা জজ রত্না খাতুনকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন। ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। পরে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন আসামি।
সাক্ষ্য-প্রমাণে অসংগতি ও খালাস
হাইকোর্টে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ শুনানিকালে প্রমাণ করেন যে, রত্না খাতুনের কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের অভিযোগ নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল—মামলার বাদী নিজেই তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন।
মামলার নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি ছাড়া অন্য কোনও প্রসিকিউশন সাক্ষী মাদক উদ্ধারের ঘটনাকে সমর্থন করেননি। জব্দতালিকার দুই সাক্ষীর বক্তব্যেও মারাত্মক অসংগতি পাওয়া যায়। একজন সাক্ষী জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি কেবল জব্দতালিকায় স্বাক্ষর করেন, মাদক উদ্ধারের বিষয়ে তার প্রত্যক্ষ কোনও জ্ঞান ছিল না। অপর সাক্ষী জানান, তিনি মোটর শ্রমিক কার্যালয়ে বসে থাকার সময় অধিদফতরের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তার স্বাক্ষর নেন।
সার্বিক বিষয় এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের এই দুর্বলতা আমলে নিয়ে হাইকোর্ট রিভিশনের রুল যথাযথ ঘোষণা করেন এবং আপিল খারিজের রায় বাতিল করে রত্না খাতুনকে বেকসুর খালাস দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মঞ্জুরুল আলম সুজন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইকোর্টের এই রায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশি ও জব্দ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।