দেনমোহর আদায়ে বাধ্য করা হলে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারবেন আদালত: হাইকোর্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক আদালত বার্তা ঃ ৭ই অক্টোবর ২০২৬
স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দেনমোহর পরিশোধ না করে স্ত্রীকে তা আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করা হলে, পারিবারিক আদালত তার বিবেচনাধিকার (Discretionary power) প্রয়োগ করে স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন।
ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন দেওয়ানি রিভিশন মামলা খারিজ করে বিচারপতি মো. আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রতি এই রায় প্রদান করেছেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া এই রায়ের ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
হাইকোর্টের রায়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:
র কোনো অংশ মওকুফ করার এখতিয়ার আদালতের নেই। স্ত্রী কেবল স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেনমোহর মওকুফ করতে পারেন। বলপ্রয়োগ বা প্রবঞ্চনার মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্মতি বৈধ মাফ হিসেবে গণ্য হবে না।মামলার পটভূমি ও বিচারিক প্রক্রিয়া
২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর শরিয়াহ মোতাবেক ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে ইয়াকুব আলীর সঙ্গে তানজিদা নাসরিনের বিয়ে হয়। তাদের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক কলহের জেরে ২০১৭ সালে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে স্বামী তালাক প্রদান করেন।
তালাক কার্যকর হওয়ার পর বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন খোরপোশ এবং সন্তানের খোরপোশ দাবি করে ২০১৯ সালে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন স্ত্রী সানজিদা। ২০২২ সালের ২৫ মে সিনিয়র সহকারী জজ আদালত স্ত্রীর পক্ষে রায় দেন। রায়ে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ, ইদ্দতকালীন খোরপোশ ৩০ হাজার এবং সন্তানের বকেয়া খোরপোশ ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ৬০ দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া সন্তানের বিয়ের আগ পর্যন্ত মাসিক ৭ হাজার টাকা (বার্ষিক ১০% বৃদ্ধিসহ) খোরপোশ ধার্য করা হয়।
এই একতরফা রায়ের বিরুদ্ধে জজ আদালতে আপিল করেন স্বামী। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজ (৫ম আদালত) আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর স্বামী হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন দায়ের করেন।
আইনজীবীদের যুক্তি ও হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্টে আবেদনকারী স্বামীর পক্ষে আইনজীবী মো. নাজের উদ্দিন দাবি করেন, ডিক্রিকৃত টাকার ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে অবশিষ্ট বকেয়া কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চাওয়া হয়।
বিপরীতে স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান ও তানজিলা রহমান জুঁই (সঙ্গে ছিলেন ইফফাত হাসান শাম্মী) যুক্তি দেন যে, স্বামী সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী ও সন্তানের আইনি অধিকার বিলম্বিত করছেন।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে হাইকোর্ট জানান, কনে ও বরের আর্থিক সামর্থ্য বা সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী ধার্য করা দেনমোহরের লিখিত চুক্তির শর্তাবলির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রিতে কোনো আইনি ত্রুটি বা এখতিয়ারগত ভুল না থাকায়, হাইকোর্ট স্বামীর রিভিশন আবেদনটি খারিজ করে দেন এবং অবিলম্বে রায়ের প্রতিলিপিসহ অধস্তন আদালতের নথি ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।