নারী মরদেহের পোস্টমর্টেমে নারী ডোম নিয়োগ চেয়ে হাইকোর্টে রিট
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ ১৩ জুলাই, ২০২৬
কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | বাংলাদেশের সব সরকারি ও ময়নাতদন্তকারী হাসপাতালে মৃত নারীদের মরদেহের সম্ভ্রম, গোপনীয়তা ও ধর্মীয় বিধান রক্ষা এবং মর্গে বিকৃত যৌনাচার রোধে অনতিবিলম্বে ‘নারী ডোম’ নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থমূলক রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে।
আজ সোমবার (১৩ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মনির উদ্দিন জনস্বার্থে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই ব্যতিক্রমী ও যুগোপযোগী রিট আবেদনটি দায়ের করেন।
রিটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ (ডিজিএইচএস) সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এর আগে বাংলাদেশের পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়া হাসপাতালগুলোতে অন্তত একজন করে নারী ডোম নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটি আইনি আবেদন জমা দিয়েছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ মনির উদ্দিন। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ বা সাড়া না পাওয়ায় তিনি আজ সুপ্রিম কোর্টের উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
দাখিলকৃত রিট আবেদনে সমাজ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের আলোকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে:
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও পর্দার বিধান: বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ রাষ্ট্র। ইসলাম ধর্মসহ দেশের প্রচলিত সকল ধর্মেই নারীর মরদেহ সতর বা পর্দার অন্তরালে সম্মানজনকভাবে রাখার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। ময়নাতদন্ত একটি আইনি প্রক্রিয়া হলেও মৃত নারীর ক্ষেত্রে পর-পুরুষের স্পর্শ বা অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিবারের মানসিক বিপর্যয় রোধ: সড়ক দুর্ঘটনা, হত্যাকাণ্ড বা অন্য কোনো আকস্মিক কারণে যদি কোনো নারী মারা যান, তবে তার পরিবার এমনিতেই চরম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। এরকম পরিস্থিতিতে যখন স্বজনেরা জানতে পারেন যে কোনো পুরুষ সদস্য তাদের পরিবারের প্রিয় নারী সদস্যের পোশাক খুলে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে, তা তাদের জন্য আরও বেশি হৃদয়বিদারক ও কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। সেখানে একজন নারী ডোম এই স্পর্শকাতর কাজটি করলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মানসিকভাবে সান্ত্বনা পেতো।
লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ: বর্তমান যুগে নারীরা সব চ্যালেঞ্জিং ক্ষেত্রে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সফলভাবে কাজ করছেন। ময়নাতদন্তের মতো জায়গায় যদি প্রশিক্ষিত নারী ডোম নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে কর্মক্ষেত্রে যেমন বৈষম্য দূর হবে, তেমনি ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতাও রক্ষা পাবে।
মানবাধিকার ও মরণোত্তর গোপনীয়তা: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, মৃত্যুর পরও একজন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
রিট আবেদনে দেশে ও বিদেশে মর্গের ভেতরে পুরুষ ডোমদের দ্বারা মৃত নারীদের শরীরে বিকৃত যৌনাচার ও ধর্ষণের একাধিক লোমহর্ষক ও প্রমাণিত নজির তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে:
ময়মনসিংহ মেডিকেলের ঘটনা (২০২৫): গত বছরের ২২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য রাখা এক তরুণীর মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার (নেক্রোফিলিয়া) করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে মর্গের ডোম আবু সাঈদের (২৯) বিরুদ্ধে। মর্গের ল্যাব টেস্ট ও চিকিৎসক দল বিষয়টি নিশ্চিত করার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে, যা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ঘটনা (২০২০): এর আগে ২০ নভেম্বর ২০২০ সালে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে লাশের সঙ্গে নিয়মিত বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগে মুন্না ভগত (২০) নামে এক ডোমকে সিআইডি গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর সে আদালতে নিজের এই পৈশাচিক অপরাধের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।
আন্তর্জাতিক নজির (যুক্তরাষ্ট্র): আবেদনে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট টেনে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও অঙ্গরাজ্যের একটি মর্গের রক্ষী কেনেট ডগলাস (৬০) নিজের মুখে স্বীকার করেছে যে, সে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত রাতের শিফটে ডিউটি করার সময় মর্গে আসা প্রায় ১০০ জন মৃত মহিলার লাশের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিল।
রিটকারী আইনজীবী উল্লেখ করেন, এই ধরনের বিকৃত মানসিকতার হাত থেকে মৃত নারীদের মরদেহের সম্ভ্রম রক্ষা করা একটি যুগোপযোগী ও অতি জরুরি চাহিদা। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো স্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করতে বাংলাদেশের প্রতিটি ময়নাতদন্ত কেন্দ্রে অবিলম্বে নারী ডোম নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নীতিমালা প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে