নির্বাহী বিভাগে বিচারকদের প্রেষণ: বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের পথে প্রধান অন্তরায় 
বিশেষ প্রতিবেদক, আদালত বার্তাঃ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিচারকদের মূল ও পবিত্রতম দায়িত্ব হলো এজলাসে বসে বিচারিক কার্য পরিচালনা করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু বিচারিক দায়িত্বের বাইরে নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরে (যেমন সহকারী সচিব বা উপসচিব পদে) বিচারকদের প্রেষণে বা ডেপুটেশনে নিয়োগ দেওয়ার যে প্রথা চলমান, তা স্বাধীন বিচারব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রেষণ প্রথা কেবল বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথেই অন্তরায় নয়, বরং এটি বিচারকদের পেশাগত নৈতিকতা এবং দ্রুত ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও এক বড় বাধা।
সংবিধানের নির্দেশনা ও মাসদার হোসেন মামলার রায়
বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের কথা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সাংবিধানিক নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই ১৯৯৯ সালে ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার যুগান্তকারী রায় প্রদান করা হয়, যা বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরি করেছিল। সেই রায়ের আলোকে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক হলেও, বাস্তবে এর সুফল পুরোপুরি মেলেনি। আইন কমিশনের এক প্রতিবেদনেও আক্ষেপ করে বলা হয়েছে, এত বছর পেরিয়ে গেলেও কার্যক্ষেত্রে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা আজও যেন ‘সোনার হরিণ’।
তীব্র মামলাজট ও প্রেষণে থাকা বিচারক সংকট
বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে চরম বিচারক সংকট বিরাজ করছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিচারক স্বল্পতার কারণে এমনিতেই যখন বিচারিক কার্যক্রম হিমশিম খাচ্ছে, তখন প্রায় দেড় থেকে দুই শতাধিক বিচারক প্রেষণে আইন মন্ত্রণালয়, সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন, আইন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি ও প্রশাসনিক দপ্তরে কাজ করছেন। আইন মন্ত্রণালয়েই বড় সংখ্যক বিচারক প্রশাসনিক বা নির্বাহী পদে নিযুক্ত রয়েছেন। একদিকে এজলাসে বিচারকের ঘাটতি, অন্যদিকে প্রশাসনিক ডেস্কে বিচারকদের পদায়ন—এই দ্বিমুখী নীতির ফলে মামলাজট যেমন বাড়ছে, তেমনি বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
নৈতিকতার সংকট ও জবাবদিহির অভাব
একজন বিচারককে যখন প্রেষণে নির্বাহী বিভাগে বা মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়, তখন স্বভাবতই তাঁকে সরকারের প্রশাসনিক আদেশের অধীনস্থ থাকতে হয়। এই আমলাতান্ত্রিক চেইন অব কমান্ড একজন বিচারকের স্বাধীন বিচারিক সত্তা ও মননের পরিপন্থি। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার কথা, বিচারকেরা নিজেরাই যদি ডেপুটেশনের মাধ্যমে সেই নির্বাহী বিভাগের অংশ হয়ে যান, তবে সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি পরোক্ষভাবে বিচার বিভাগের নৈতিক ভিত্তি ও আস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
প্রেষণ প্রথার এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা নিশ্চিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছিলেন আইনজীবীরা। আশার কথা হলো, দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ সম্প্রতি বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে একটি স্বতন্ত্র 'সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়' প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাও দিয়েছেন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্বাহী বিভাগের ওপর বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে।
একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রেষণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে। প্রশাসনিক দপ্তরের কোনো চেয়ার নয়, বরং এজলাসের বিচারিক আসনই একজন বিচারকের প্রকৃত অবস্থান। বিচারকদের এই বিচারিক সততা ও স্বাধীনতাই পারে নির্বাহী বিভাগকে আইনের আওতায় এনে দেশে আইনের শাসন ও সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে।