শাহবাগে এক নারীর একক প্রতিবাদ: “ঢাকা বাঁচাতে হকার উচ্ছেদ জরুরি”—বিতর্কের কেন্দ্রে নতুন প্রশ্ন
স্টাফ রিপোর্টার,আদালত বার্তাঃ১২ মে ২০২৬
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা শাহবাগ। চারপাশে মানুষের ভিড়, যানজট, কোলাহল—সবকিছুর মাঝেই শনিবার বিকেলে দেখা গেল এক ভিন্ন দৃশ্য। শত মানুষের ভিড়ের মাঝেও একা দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন নারী, হাতে একটি প্ল্যাকার্ড। তার নাম সোহানী শিফা। প্ল্যাকার্ডে লেখা—“ঢাকা বাঁচাও, হকার হটাও।”
প্রথম দৃষ্টিতে এটি আর দশটা হকারবিরোধী অবস্থানের মতো মনে হলেও, তার বক্তব্যে উঠে আসে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি—যা শুধু নগর ব্যবস্থাপনা নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
সোহানী শিফা বলেন, “আমি আজ ৬০ টাকা কেজি চাল খাচ্ছি। কাল যদি ১২০ টাকা কেজি চাল খেতে হয়, তখন কী করব?” তার এই বক্তব্যে অনেকে বিস্মিত হলেও, তিনি দ্রুতই তার যুক্তির ব্যাখ্যা দেন।
তার মতে, হকার সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে দেশের কৃষি খাতের। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষি শ্রমিকের সংকট।
“গ্রামে গেলে দেখবেন, কাজ করার মতো পুরুষ মানুষ নেই। তারা সবাই ঢাকায় চলে এসেছে। কেউ ফুটপাতে সবজি বিক্রি করছে, কেউ ফল, কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছে। কৃষিকাজের চেয়ে শহরের এই কাজগুলো তাদের কাছে সহজ মনে হচ্ছে,”—বলেন তিনি।
এই বাস্তবতাকে তিনি একটি উপমার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। “মশা যদি আপনাকে কামড়ায়, আপনি কি মশা মারবেন না? মশার তো বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কিন্তু নিজের সুরক্ষার জন্য আপনাকে সেটি করতে হয়। ঠিক তেমনি, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে হকার উচ্ছেদ করতেই হবে,”—যোগ করেন সোহানী।
তার দাবি, রাজধানী থেকে হকারদের সরিয়ে তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরিয়ে নিয়ে কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করা জরুরি। অন্যথায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে, তিনি নগর ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতির দিকেও ইঙ্গিত করেন। “একদিন উচ্ছেদ অভিযান চলে, আরেকদিন দেখি রাস্তায় মেশিন দিয়ে দাগ কাটা হচ্ছে—সরকারি রাস্তা, সরকারি মেশিন। এর পেছনে কী কারণ?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শাহবাগের মোড়ে একা দাঁড়িয়ে সোহানী শিফা যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তা সহজে উপেক্ষা করার মতো নয়। তার বক্তব্যে যেমন রয়েছে নগর শৃঙ্খলার দাবি, তেমনি রয়েছে দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
তিন কোটি মানুষের এই মহানগরে একজন মানুষের একক প্রতিবাদ হয়তো ক্ষুদ্র বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তার উত্থাপিত প্রশ্নগুলো বড়—ধানক্ষেত ডুবছে, শ্রমিক কমছে, চালের দাম বাড়ছে।
এখন প্রশ্ন—এই সংকটের সমাধান কি সত্যিই হকার উচ্ছেদ, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক বাস্তবতা?