সাংবাদিকতা কি ‘মামার বাড়ির মোয়া’?
বিশেষ প্রতিবেদন | আদালত বার্তা
প্রকাশকাল: ২ অক্টোবর ২০২৬
ঘরে ঘরে সাংবাদিক, অলিগলিতে সংবাদমাধ্যম—পেশাদার সাংবাদিকতা কোথায়?
সাংবাদিকতা কি এখন যে কেউ চাইলেই হয়ে যাওয়ার মতো একটি পরিচয়? একটি ফেসবুক পেজ খুললেই কি সাংবাদিক হওয়া যায়? নিজের পছন্দমতো একটি সংবাদমাধ্যমের নাম তৈরি করে, একটি ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, ভিজিটিং কার্ড ও পরিচয়পত্র সংগ্রহ করলেই কি কেউ সংবাদকর্মী হিসেবে সমাজে প্রভাব বিস্তার করার অধিকার পেয়ে যান?
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং অনলাইনভিত্তিক সংবাদ প্রচারের সহজলভ্যতায় সাংবাদিকতার জগতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রযুক্তির কল্যাণে সাধারণ মানুষও তথ্য প্রকাশ, অনিয়ম তুলে ধরা এবং জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে পারছেন। অন্যদিকে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগও সামনে আসছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সাংবাদিকতা কি সত্যিই একটি দায়িত্বশীল পেশা, নাকি কারও কারও কাছে এটি প্রভাব বিস্তার ও অবৈধ সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হয়ে উঠছে?
পরিচয়পত্র আছে, কিন্তু সাংবাদিকতা কোথায়?
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশাগত পরিচয়পত্র, ক্যামেরা কিংবা সংবাদমাধ্যমের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনুসন্ধানী মনোভাব, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা, সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা, ভাষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থে কাজ করার অঙ্গীকার।
কিন্তু বাস্তবতার একটি অংশে দেখা যায়, কোনো কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পেজ খুলে সেটিকে সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। এরপর নিজেরাই সম্পাদক, প্রকাশক, প্রধান প্রতিবেদক কিংবা বিশেষ প্রতিনিধি পরিচয় ধারণ করছেন। কোথাও কোথাও সংবাদমাধ্যমের নামের সঙ্গে মিল রেখে পরিচয়পত্র, স্টিকার, মাইক্রোফোনের লোগো ও অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরি করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, প্রকাশনার ধারাবাহিকতা, সম্পাদকীয় কাঠামো, সংবাদ প্রকাশের নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পেশাগত দায়িত্বের জবাবদিহি কতটুকু রয়েছে?
অবশ্যই সব ফেসবুকভিত্তিক সংবাদকর্মী বা স্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে একই পাল্লায় মাপার সুযোগ নেই। অনেকেই সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে স্থানীয় সংবাদ পরিবেশন করছেন। কিন্তু সেই সুযোগের আড়ালে কেউ যদি সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিগত প্রভাব ও সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে তা পুরো পেশার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
সংবাদ সংগ্রহ, নাকি প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা?
সাংবাদিকতার কাজ হলো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ, সত্যতা যাচাই, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা এবং ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়তা করা।
কিন্তু সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কোনো কোনো ব্যক্তি সরকারি অফিস, শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহনকেন্দ্র কিংবা আবাসিক এলাকায় গিয়ে অযাচিত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যম ও জনপরিসরে উঠে এসেছে।
কোথাও সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে সুবিধা দাবি, কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদে রূপ দেওয়ার হুমকি, আবার কোথাও অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ করে কাউকে বিব্রত করার অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কেউ কেউ প্রকৃত সাংবাদিক নন; আবার কিছু ক্ষেত্রে পেশাগত পরিচয়ধারী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠতে পারে। তাই সমস্যাটিকে শুধু ভুয়া সাংবাদিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ ও পেশাগত অসদাচরণের সামগ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
সাংবাদিকতার আড়ালে চাঁদাবাজি: পেশার জন্য বড় উদ্বেগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের তথ্য থাকলে তা অনুসন্ধান করা সাংবাদিকের দায়িত্ব। কিন্তু তথ্য যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখানো, সংবাদ গোপন রাখার বিনিময়ে অর্থ দাবি করা কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা সাংবাদিকতা নয়; অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
২০২৬ সালের ১ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ফরিদপুরের বিআরটিএ কার্যালয়ে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে ভাঙচুর ও চাঁদা দাবির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটকের খবর প্রকাশিত হয়। ঘটনাটি সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার নিয়ে জনপরিসরে আলোচনার একটি উদাহরণ। তবে কোনো একটি ঘটনা দিয়ে পুরো সাংবাদিক সমাজকে বিচার করা যায় না।
একইভাবে ২০২৬ সালের জুনে বগুড়ায় একটি সংবাদমাধ্যমের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনের মামলার পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি ও প্রমাণের বিষয়টি আলাদা; অভিযোগকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
অন্যদিকে প্রকৃত সাংবাদিকরাও অনেক সময় সংবাদ প্রকাশের কারণে মামলা, হুমকি, হামলা ও হয়রানির শিকার হন। ফলে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার রোধের নামে যেন স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রণ বা হয়রানি করার সুযোগ তৈরি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
আইন কী বলে, প্রেস কাউন্সিলের ভূমিকা কোথায়?
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পেশাগত মান, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নৈতিকতার বিষয়ে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪-এর ১১ ধারায় কাউন্সিলের উদ্দেশ্য হিসেবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংরক্ষণ এবং সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার মান উন্নয়ন ও সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। একই ধারায় সাংবাদিকদের জন্য উচ্চ পেশাগত মানের আচরণবিধি প্রণয়ন এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও জনসেবার মানসিকতা গড়ে তোলার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।
আইনের ২ ধারায় ‘Working Journalist’ বা কর্মরত সাংবাদিকের একটি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেখানে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীনভাবে নিয়োজিত বিভিন্ন শ্রেণির সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর কথা বলা হয়েছে।
তবে এই সংজ্ঞাকে সাংবাদিকতার সব ধরনের আধুনিক ও অনলাইন কার্যক্রমের জন্য একমাত্র সর্বজনীন সংজ্ঞা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বিশেষ করে স্বাধীন সাংবাদিক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, নাগরিক সাংবাদিক এবং ডিজিটাল সংবাদকর্মীদের বাস্তবতা বিবেচনায় পৃথক ও সুস্পষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে সাংবাদিকদের আচরণবিধি এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের অনলাইন ডেটাবেইজ নিবন্ধনের তথ্যও রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্যে সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও ডেটাবেইজ তৈরির উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সাংবাদিকতার মান উন্নয়নের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি পরিচয়পত্রের অপব্যবহার, ভুয়া সংবাদমাধ্যমের নামে প্রতারণা এবং সাংবাদিকতার আড়ালে অপরাধের অভিযোগ মোকাবিলায় কার্যকর নজরদারি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী করা যাচ্ছে?
শিক্ষাগত যোগ্যতা বনাম পেশাগত দক্ষতা
সাংবাদিকতা একটি জ্ঞান, দক্ষতা ও দায়িত্বনির্ভর পেশা। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলে একজন সংবাদকর্মী পেশাগতভাবে উপকৃত হন। তবে কেবল নির্দিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি না থাকলেই একজন মানুষকে অযোগ্য সাংবাদিক বলা যায় না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকতায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, অনুসন্ধানী দক্ষতা ও পেশাগত নৈতিকতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সুতরাং সাংবাদিকতার যোগ্যতা নির্ধারণে শিক্ষাগত সনদের পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, আইন সম্পর্কে ধারণা, ভাষাগত দক্ষতা, নৈতিকতা এবং কাজের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ, একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর কাজ। তাঁর প্রকাশিত সংবাদ কতটা তথ্যনির্ভর, কতটা নিরপেক্ষ এবং জনস্বার্থে কতটা কার্যকর—সেটিই হওয়া উচিত পেশাগত মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব কি শুধু সদস্যপদ দেওয়া?
এখানেই সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে।
দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেসক্লাব, সাংবাদিক সমিতি ও পেশাজীবী সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনের কাজ কেবল সদস্য সংগ্রহ, পরিচয়পত্র বিতরণ কিংবা সাংগঠনিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
বরং তাদের উচিত—
১. সদস্যদের পেশাগত পরিচয় ও কর্মতৎপরতা যাচাইয়ের স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
২. সাংবাদিকতার নীতিমালা ও আচরণবিধি সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন করা।
৩. সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানির অভিযোগ পেলে নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করা।
৪. অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংগঠনের নিজস্ব বিধি অনুযায়ী শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৫. প্রকৃত সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, হুমকি ও পেশাগত হয়রানির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া।
৬. অনলাইন ও স্থানীয় পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের পেশাগত উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও নৈতিক সহায়তা দেওয়া।
৭. সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা এবং অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান—এই দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।
সাংবাদিক সংগঠনগুলো যদি নিজেদের সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে পেশার গ্রহণযোগ্যতা ও সামাজিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
প্রশাসনের দায়িত্ব: হয়রানি নয়, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত
সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে শুধু পরিচয়পত্র সন্দেহজনক কিংবা সংবাদমাধ্যমটি ছোট—এমন কারণে কাউকে হয়রানি করা বা সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
কোনো ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিচয় ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক যাচাই করতে পারে। একই সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহের বৈধ অধিকার, জনস্বার্থ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।
অভিযোগ উঠলে তা প্রমাণ, সাক্ষ্য ও আইনগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। প্রশাসন, সাংবাদিক সংগঠন ও সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে মোকাবিলা করা কঠিন।
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার নতুন বাস্তবতা
বর্তমান সময়ে ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন পোর্টাল ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংবাদ পরিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির কারণে সংবাদ প্রকাশের সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে। ফলে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের বাইরেও অনেক স্বাধীন সংবাদকর্মী জনস্বার্থে কাজ করছেন।
এই পরিবর্তনকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ডিজিটাল সাংবাদিকতার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
তবে সংবাদমাধ্যমের নাম, নিবন্ধন, মালিকানা, সম্পাদকীয় দায়িত্ব, সংবাদকর্মীদের পরিচয় এবং প্রকাশিত সংবাদের জবাবদিহির বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
একটি ফেসবুক পেজের অনুসারীসংখ্যা, একটি ক্যামেরা কিংবা একটি পরিচয়পত্র কোনো ব্যক্তির পেশাগত সততার নিশ্চয়তা দেয় না। একইভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের পরিচয়ও কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না।
সাংবাদিকতার পরিচয় নয়, দায়িত্বই হোক প্রধান
সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম নয়; এটি জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের শক্তি তাঁর ক্যামেরা, পরিচয়পত্র কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়—তাঁর শক্তি তথ্য, যুক্তি, সততা, সাহস ও পেশাগত নিরপেক্ষতা।
সাংবাদিকতার নামে যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল, চাঁদাবাজি কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেন, তাঁদের নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
এখানে প্রশ্নটি কাউকে সাংবাদিক হতে বাধা দেওয়ার নয়; বরং সাংবাদিকতার পরিচয়কে অপব্যবহার থেকে রক্ষা করার।
সাংবাদিকতা যদি সত্য, দায়িত্ব ও জনস্বার্থের জায়গা থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি পেশা নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং গণতান্ত্রিক সমাজের জবাবদিহির ভিত্তি।
তাই সময় এসেছে সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা রক্ষা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ পরিচয়ব্যবস্থা এবং অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণের।
সাংবাদিকতা কারও ব্যক্তিগত দাপটের লাইসেন্স নয়; এটি জনগণের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা।