
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তাঃ১১ আগস্ট, ২০২৬
আইনগত সহায়তার পরিধি সম্প্রসারণ এবং বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও ভোগান্তিহীন বিচারিক সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (Alternative Dispute Resolution - ADR), বিশেষত মধ্যস্থতা (Mediation) কার্যক্রম চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ৮টি আইনের নির্ধারিত ধারাসমূহের আওতায় এই মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
গত রবিবার (০৯ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) মোঃ আল-ইমরান খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে (বিজ্ঞপ্তি নং- ৩০১) এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের উভয় বিভাগের মাননীয় বিচারপতিগণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা মধ্যস্থতা পরিচালনার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সদয় অনুমতি প্রদান করেছেন।
বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে মামলার যে দীর্ঘ জট রয়েছে, তা নিরসনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা ADR একটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার। দেশের দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত বিচারপ্রার্থীরা প্রায়শই দীর্ঘমেয়াদি মামলার ব্যয় ও ভোগান্তি বহন করতে পারেন না।
সরকারের ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’-এর আওতায় লিগ্যাল এইড অফিসগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে আইনি সেবা দিয়ে আসছে। এবার সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে মধ্যস্থতা (Mediation) চালু করার মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীরা কোনো প্রথাগত মামলাজট বা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়ে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। এটি সমাজের প্রান্তিক মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি সহজ করার পাশাপাশি উচ্চ আদালতের ওপর মামলার চাপ কমাতেও ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে।
হাইকোর্ট বিভাগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সুপ্রীম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে প্রাথমিক পর্যায়ে নিম্নলিখিত ৮টি আইনের নির্দিষ্ট ধারার বিষয়াবলীতে মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে:
|
ক্র. নং |
আইনের নাম |
সংশ্লিষ্ট ধারা/বিষয়াবলী |
|---|---|---|
|
১ |
পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ |
ধারা ৫ (পারিবারিক বিরোধ, দেনমোহর, খোরপোষ ও সন্তান অভিভাবকত্ব) |
|
২ |
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ |
ধারা ৫ (সন্তানের নিকট হতে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ লাভ) |
|
৩ |
যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ |
ধারা ৩ ও ৪ (যৌতুক দাবি ও প্রদানের অপরাধ সংক্রান্ত) |
|
৪ |
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ |
ধারা ১১(গ) (যৌতুকের জন্য সাধারণ আঘাত সংক্রান্ত বিরোধ) |
|
৫ |
দণ্ডবিধি (The Penal Code, 1860) |
ধারা ১৪৩, ৪৪৭, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩৫৪, ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮১, ৪০৬, ৪১৭, ৪২০, ৪৯৪, ৫০০, ৫০১ ও ৫১১ (আপসযোগ্য বিভিন্ন সাধারণ অপরাধ) |
|
৬ |
নির্দিষ্ট প্রতিকার আইন (The Specific Relief Act, 1877) |
ধারা ৮, ৯, ১২, ৩৯, ৪২ ও ৫৪ (স্বত্ব দখল, চুক্তি প্রবল, দলিল বাতিল ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা) |
|
৭ |
হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন (The Negotiable Instruments Act, 1881) |
ধারা ১৩৮ (চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত বিরোধ)
|
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে: সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডের এই যুগান্তকারী উদ্যোগ দেশে 'বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির' সংস্কৃতিকে আরও মজবুত করবে এবং সাধারণ মানুষের সুশাসন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করবে।তাছাড়া
বিনামূল্যে আইনি সেবা ও বিচার পাওয়ার অধিকার: ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’-এর ২৫ বছরের পথচলা
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী "সকল নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।" কিন্তু বাস্তবে অর্থসংকট, সচেতনতার অভাব এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশের একটি বড় অংশের মানুষ—বিশেষ করে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী—ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল। এই বৈষম্য দূর করতে এবং অসচ্ছল নাগরিকদের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে আইনি সেবা পৌঁছে দিতে ২০০০ সালে প্রণীত হয় ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’। গত আড়াই দশকে এই আইনের অধীনে পরিচালিত সরকারি লিগ্যাল এইড অফিসগুলো প্রান্তিক মানুষের বিচার পাওয়ার শেষ ভরসাস্থল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
২০০০ সালে আইনটি পাস হলেও মূলত ২০০৯ সালের পর থেকে এর কার্যক্রম নতুন গতি পায়। আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ (National Legal Aid Services Authority - NLASA) গঠিত হয়।
সংস্থার মূল লক্ষ্য হলো:
দেশের ৬৪টি জেলা জজ আদালতে স্থাপিত জেলা লিগ্যাল এইড অফিস এবং অন্যান্য বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল বা সংস্থায় এই সেবা দেওয়া হয়।
১. বিনা খরচে আইনজীবী নিয়োগ: দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় প্রকার মামলায় অসচ্ছল পক্ষকে বিনামূল্যে আইনজীবী দেওয়া হয়।
২. মামলা পরিচালনার খরচ বহন: কোর্ট ফি, প্রসেস ফি, দলিলপত্রের নকল তোলাসহ মামলার প্রাথমিক আনুসঙ্গিক খরচ সরকার বহন করে।
৩. বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR): আদালতে দীর্ঘমেয়াদী মামলা না চালিয়ে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে দ্রুত এবং বিনামূল্যে বিরোধ সমাধানের জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারদের (যাঁরা সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ পদমর্যাদার বিচারক) ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
৪. পারিবারিক ও শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তি: পারিবারিক কলহ, দেনমোহর, খোরপোষ আদায় এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আইনি সহায়তা প্রদান।
৫. **টোল ফ্রি হেল্পলাইন (১৬৪৩০):**যেকোনো নাগরিক জাতীয় নম্বর ১৬৪৩০-এ কল করে বিনা খরচে তাৎক্ষণিক আইনি পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন।
আইনের আওতায় যাদের বিনামূল্যে সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে:
জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই দশকে লাখ লাখ মানুষ এই সেবার মাধ্যমে আইনি অধিকার ফিরে পেয়েছেন।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (ADR) সুফল:
লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে লাখ লাখ পারিবারিক ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ আদালতের বাইরেই মীমাংসা করা সম্ভব হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ কোর্টের চক্কর ও বিপুল অর্থ ব্যয় থেকে রক্ষা পাচ্ছেন, অন্যদিকে আদালতগুলোতে মামলার জট কমছে।
বিশেষ করে গ্রাম বা মফস্বলের অসহায় নারী, যাঁরা পারিবারিক নির্যাতন বা স্বামীর কাছ থেকে খোরপোষ পাচ্ছিলেন না, লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে খুব সহজেই তাঁদের পাওনা বুঝে পাচ্ছেন।
অসামান্য সাফল্য সত্ত্বেও লিগ্যাল এইড সেবা পুরোপুরি কার্যকর করতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:
‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ কেবল একটি আইন নয়, এটি সুবিচারের প্রতীক। রাষ্ট্র যে প্রতিটি নাগরিকের আইনি সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—এই আইনটি তারই প্রমাণ। প্রান্তিক মানুষের কাছে এই সেবার বার্তা পৌঁছে দিতে পারলে এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের আইনি সহায়তা কেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করলে দেশ থেকে বিচারহীনতা ও বৈষম্য অনেকাংশে দূর করা সম্ভব হবে।