আদালত বার্তা ডেস্ক
ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলে সম্প্রতি দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ ওঠার পর প্রশাসন কর্তৃক তাঁদের আসন বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আইন ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শৃঙ্খলাবিধিতে 'সমকামিতা' বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারা না থাকা এবং জাতীয় আইনি কাঠামোতেও বিষয়টি সরাসরি সংজ্ঞায়িত না থাকায় প্রশাসনিক ও আইনি প্রয়োগের জায়গাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আইনি গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে 'সমকামিতা' শব্দটিকে সরাসরি সংজ্ঞায়িত করা বা উল্লেখ করা হয়নি। তবে ১৮৬০ সালের ব্রিটিশ আমলের 'দ্য পেনাল কোড'-এর ৩৭৭ ধারায় 'প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে' শারীরিক সম্পর্ক বা 'আন-ন্যাচারাল অফেন্সেস' (Unnatural Offences)-এর আওতায় বিষয়টিকে বিচারিক কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে।
পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারার সারসংক্ষেপ:
কোনো ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী বা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আইনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই অপরাধটি সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্কের স্থানে কেবল অনুপ্রবেশ (Penetration) ঘটাই আইনত যথেষ্ট বলে গণ্য হয়। ঘটনার পরিস্থিতি ও আনুষঙ্গিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আদালত সাজার পরিমাণ নির্ধারণ করে থাকেন।
বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় সমকামিতাকে সরাসরি স্বীকৃতি যেমন দেওয়া হয়নি, তেমনি 'সমকামিতা' শব্দবন্ধ দিয়ে পৃথক কোনো অপরাধও সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।
বাংলাদেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে সমলিঙ্গের সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত। সামাজিক এই কাঠামোর কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ জাতীয় ঘটনা প্রকাশ্যে এলে প্রশাসনিক বা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদ থেকেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক আইনি পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়:
রায় (২০১৮): বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে ৩৭৭ ধারার প্রয়োগ শিথিল করে সম্মতিক্রমে সমকামিতাকে অপরাধমুক্ত ঘোষণা করে, যদিও সেখানে সমলিঙ্গের বিয়ের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের সাম্প্রতিক ঘটনাটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাবিধি এবং দেশের মূল আইনের স্পষ্টতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। আইনি প্রথা, মানবাধিকার এবং সামাজিক মূল্যবোধের এই টানাপোড়েনে আগামী দিনে বিচারিক ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা কীভাবে রূপ নেয়—তা-ই এখন দেখার বিষয়।