
যৌন নির্যাতন যেন ‘রাষ্ট্রীয় নীতি’
ইসরায়েলের কারাগারে শিকল দিয়ে বেঁধে পালাক্রমে চলে ধর্ষন
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ১১এপ্রিল ২০২৬
ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতন যেন ‘একটি সংগঠিত রাষ্ট্রীয় নীতি’—এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে নতুন এক প্রতিবেদনে। মানবাধিকার সংস্থা ইউরো-মেডিটেরেনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের সংগ্রহ করা সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচারিক পর্যায়ের অনুমোদনেই এই নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন সহিংসতার পরিধি ভয়াবহ, যার মধ্যে রয়েছে শিকল দিয়ে বেঁধে সেনাদের পালাক্রমে ধর্ষণ, বস্তু ব্যবহার করে ধর্ষণ, প্রশিক্ষিত সামরিক কুকুর দিয়ে নির্যাতনসহ নানা পদ্ধতি। এসব নির্যাতন ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় সংঘটিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
উত্তর গাজার এক ৪২ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি যিনি কুখ্যাত সদে তেইমান কারাগারে বন্দি ছিলেন। তিনি জানান, তাকে নগ্ন অবস্থায় ধাতব টেবিলে বেঁধে দুই মুখোশধারী সেনা টানা দুই দিন ধর্ষণ করেছিল। তিনি বলেন, তাকে সারা রাত শিকল পরিয়ে নগ্ন করে রক্তাক্ত অবস্থায় বেঁধে রাখা হয় এবং পরদিন সেনারা আবারও একই কায়দায় ধর্ষণ অব্যাহত রাখে।
তিনি বলেন, ‘আমি মৃত্যু কামনা করছিলাম। এটি যেন দেয়ালের আড়ালে আরেকটি গণহত্যা।’ তার এই নির্যাতনের পুরো ঘটনা ভিডিও করা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় সেই ভিডিও দেখিয়ে তাকে হুমকি দেয়া হয়, সহযোগিতা না করলে তা প্রকাশ করা হবে।
আরেকজন ৩৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি বন্দি জানান, তাকে নগ্ন করে সেনারা কুকুর দিয়ে নির্যাতন চালায়। তিনি বলেন, ‘কুকুরটি প্রশিক্ষিতভাবে আমাকে আক্রমণ করে। এটা বেশ কয়েক মিনিট ধরে চলেছিল। আমি চরমভাবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত বোধ করেছিলাম।’
সাবেক বন্দি বিষয়ক কমিশনের একজন আইনজীবী খালেদ মাহাজনা বর্ণনা করেছেন, কীভাবে সদে তেইমান কারাগারে একজন সেনা একজন ফিলিস্তিনি বন্দির মলদ্বারে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের নল ঢুকিয়ে দেয়, যার ফলে তার মারাত্মক অভ্যন্তরীণ আঘাত ও তীব্র যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়।
আরেক বন্দি ৪৩ বছর বয়সী ওয়াজদি জানান, তাকে ধাতব বিছানায় বেঁধে সেনা ও প্রশিক্ষিত কুকুর দ্বারা বারবার ধর্ষণ করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি তীব্র ব্যথা অনুভব করছিলাম এবং চিৎকার করছিলাম, কিন্তু যতবারই চিৎকার করেছি, প্রতিবারই আমাকে মারধর করা হয়েছে। সেনারা তখন ভিডিও করছিল এবং উপহাস করছিল।’
তিনি আরও জানান, এরপর তাকে বাঁধনমুক্ত করা হলে কুকুরটি তাকে ধর্ষণ করে। এছাড়া জোর করে আরও বীভৎসভাবে আরও সেনারা এসে তাকে বারবার ধর্ষণ করে। এমনকি তার ওপর প্রস্রাবও করা হয়।
ইউরো-মেডের একজন ফিল্ড গবেষক খালেদ আহমেদ মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘এই ঘটনাটি বিশেষভাবে মর্মান্তিক, কারণ এটি পরিকল্পিত অপমানের সাথে যুক্ত শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক—প্রায় সব ধরনের নির্যাতনের এক সম্মিলিত রূপকে প্রতিফলিত করে। এটি পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতার এক দীর্ঘায়িত ধারা। এগুলো এমন সব কাজ যা বোধগম্যতারও বাইরে।’
ভুক্তভোগীদের কিছু সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী আহমেদ বলেন, ‘এই প্রক্রিয়াটি কোনোভাবেই সহজ কাজ ছিল না। ভুক্তভোগীরা যে বিবরণ দিয়েছেন এবং যেভাবে তারা আবেগ ও ঘটনাগুলো পুনরায় অনুভব করেছেন, তা ছিল হৃদয়বিদারক।’
তিনি বর্ণনা করেন, কীভাবে কিছু ভুক্তভোগী তাদের গল্প বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘প্রতিশোধের ভয় এবং যৌন নির্যাতনকে ঘিরে সামাজিক কলঙ্কের কারণে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কেউ কেউ একেবারেই কথা বলেননি। কিন্তু আমরা যা লক্ষ্য করেছি তা হলো, তারা সবাই যা ঘটেছিল সে সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলছিলেন যেন তারা ঘটনাটি চোখের সামনে দেখছেন। তারা প্রতিটি খুঁটিনাটি মনে রেখেছিলেন, যেন দৃশ্যটি তাদের স্মৃতিতে খোদাই হয়ে গেছে এবং তা আর কখনো মুছে যাবে না।’
একটি জটিল অপরাধ
ইউরো-মেড মনিটর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, সাক্ষ্যগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এগুলো ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক নেতাদের দ্বারা সমর্থিত একটি নীতির প্রমাণ, যা হয় সরাসরি আদেশের মাধ্যমে অথবা মৌন অনুমোদনের দ্বারা এবং দায়মুক্তির এক পরিবেশের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে।
এই নির্যাতনের ব্যাপকতা সম্ভব হয়েছে আইন, সামরিক নির্দেশ এবং জরুরি প্রবিধানের মাধ্যমে, যেমন- ‘অবৈধ যোদ্ধা আইন’, যা বিচারিক তদারকি ছাড়াই আটক করার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বন্দিদের যেকোনো আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করেছে।
এই আইনি ব্যবস্থাগুলো ফিলিস্তিনি বন্দিদের জোরপূর্বক গুম করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলি আটক কেন্দ্রগুলোকে জবাবদিহিতাহীন ‘ব্ল্যাক হোল’-এ রূপান্তরিত করেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সদে তেইমান কারাগার, যেখানে একাধিক প্রতিবেদনে নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যার ব্যাপকতার কথা বলা হয়েছে। রেড ক্রস এবং আইনজীবীদেরও প্রবেশ করতে দেয়া হয় না সেখানে।
প্রতিবেদনটিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, এই নির্যাতনের দায় শুধু এর অপরাধীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; চিকিৎসা ও আইনি কর্মী এবং ইসরায়েলি বিচার ব্যবস্থার যোগসাজশে এটি আরও সহজ হয়েছে। ইউরো-মেড জানিয়েছে, চিকিৎসকেরা অপরাধীদের পরিচয় গোপন করে, চিকিৎসা নথিতে ভুক্তভোগীদের আঘাতের বিবরণ চাপা দেয় এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উপযুক্ত সনদপত্র দিয়ে নির্যাতনের ঘটনাগুলো ধামাচাপা দিতে সাহায্যও করেছে তারা।
এছাড়া ইসরায়েলি বিচার ব্যবস্থা ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের দেয়া সাক্ষ্যপ্রমাণ সীমিত করে এবং গুরুতর ঘটনাগুলোকে লঘু অপরাধ হিসেবে পুনঃশ্রেণীবদ্ধ করে অপরাধীদের রক্ষা করেছে, যার ফলে খারিজ হয়ে গেছে ভুক্তভোগীদের অভিযোগগুলো।
এদিকে মার্চ মাসে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ঘোষণা করে যে, সদে তেইমানে একজন ফিলিস্তিনি বন্দিকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত পাঁচ সেনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তারা প্রত্যাহার করছে, যদিও ফাঁস হওয়া
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বন্দিকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে সেনারা তাকে ঘিরে রেখেছে।