বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১২ অপরাহ্ন
Title :
প্রশ্ন করা সাংবাদিকের পেশাগত অধিকার: রাজনৈতিক মতাদর্শ ফৌজদারি অপরাধ নয় বাংলাদেশ কি সত্যিই গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হতে পেরেছে?  রাজনৈতিক বিভাজন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির অন্তরালে সংকট—উত্তরণের পথ কোনটি? ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.): মহানবীর জীবনাদর্শে শান্তি, মানবতা ও ন্যায়ের আহ্বান ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি: ন্যায়বিচারের সহায়ক নাকি অতিনির্ভরতার ঝুঁকি? কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন না জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যরা যে কারণে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পেলেন ১০ আসামি নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে প্রমাণের গুরুত্ব ও বিচারিক বিচক্ষণতার প্রশ্ন বাংলাদেশ: রাজনৈতিক বিরোধীদের অনির্দিষ্টকালীন বিচার-পূর্ব আটক বন্ধ করুন – হিউম্যান রায়টস ওয়াচ নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের বদলে ২ জনের ফাঁসি বহাল, ১০ জন খালাস; ৪ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড দ্রুত বিচার নয়, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি নতুন করে আলোচনায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন এসএনএ চার্জ ইউনিটপ্রতি আধা পয়সা—১,১৬০ মেগাওয়াটে বছরে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা

প্রশ্ন করা সাংবাদিকের পেশাগত অধিকার: রাজনৈতিক মতাদর্শ ফৌজদারি অপরাধ নয়

  • প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে

প্রশ্ন করা সাংবাদিকের পেশাগত অধিকার: রাজনৈতিক মতাদর্শ ফৌজদারি অপরাধ নয়

বিশেষ প্রতিবেদক, আদালত বার্তা

ঢাকা | ২৫ আগস্ট ২০২৬

​একজন সাংবাদিকের হাতে কোনো অস্ত্র থাকে না; তার একমাত্র হাতিয়ার প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন কখনো ধারালো, কখনো ক্ষমতাবানের জন্য অস্বস্তিকর, আবার কখনো বা ক্ষমতা বলয়ের অনুকূল। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রশ্ন করার এই মৌলিক অধিকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।

​বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের দীর্ঘ কারাবাস ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করার প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক আইনি প্রশ্ন সামনে এসেছে—সাংবাদিকের পেশাগত প্রশ্ন বা সম্পাদকীয় অবস্থান কি মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ হতে পারে? রাজনৈতিক পক্ষপাত বা ক্ষমতাঘনিষ্ঠতা কি কোনো ফৌজদারি অপরাধ?

ট্রাইব্যুনালে নতুন অভিযোগ ও মামলার প্রেক্ষাপট

​গত ২৪ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, ভোরের কাগজের সাবেক সম্পাদক শ্যামল দত্ত এবং একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলন কেন্দ্রিক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ২৫ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

​প্রসিকিউশনের অভিযোগের মূল ভিত্তি হলো—২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের করা কিছু প্রশ্ন ও মন্তব্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানি হিসেবে কাজ করেছিল।

​জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার হওয়া অপরিহার্য। যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ড, নির্দেশ বা অর্থায়নে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু অপরাধের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং একজন সাংবাদিকের রাজনৈতিক আনুগত্য বা বিতর্কিত সম্পাদকীয় ভূমিকার মধ্যে আইনি সীমারেখা টানা অত্যন্ত জরুরি।

আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ও আইনি যুক্তি

​সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগ নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং গণমাধ্যম অধিকার সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে:

  • কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (CJA): সংস্থাটির সাম্প্রতিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্বের অংশ। বিশ্বাসযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ ছাড়া কেবল প্রশ্ন করার কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।
  • কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ): এপ্রিল ২০২৬-এ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটি অভিযোগপত্র ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সাংবাদিকদের দীর্ঘকালীন আটকাদেশের নিন্দা জানায় এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি তোলে।
  • জাতিসংঘের মতামত (UN WGAD): জাতিসংঘের নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রবীণ সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের আটকাদেশকে ‘আইনি ভিত্তিহীন ও নির্বিচার’ উল্লেখ করে তার মুক্তির আহ্বান জানিয়েছিল।
  • হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW): সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক সংবাদ পরিবেশন বা সম্পাদকীয় মতামতকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে মেলানো সংবাদমাধ্যমে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করবে।
  • আইনি ও বিশ্লেষণী দৃষ্টিকোণ: ব্রিটিশ সাংবাদিক ও গবেষক ডেভিড বার্গম্যান লিখেছেন, রাজনৈতিক আনুগত্য বা বিতর্কিত বক্তব্য কঠোর সমালোচনার যোগ্য হতে পারে, কিন্তু তা ফৌজদারি অপরাধ নয়। এজাহারে নাম থাকাই হত্যাকাণ্ডের উসকানি বা অর্থায়নের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না।

দীর্ঘ কারাবাস ও জামিন জটিলতা

​২০২৬ সালের মে মাসে বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা দিবসের তথ্য অনুযায়ী, ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত ও শাহরিয়ার কবির প্রায় ৬০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দী।

​আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, একটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো (শোন অ্যারেস্ট) কিংবা চেম্বার আদালতে জামিন স্থগিত হওয়ার কারণে তাদের মুক্তি মিলছে না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া এই আইনি প্রক্রিয়া নতুন সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক সীমারেখা

​গণতান্ত্রিক বিশ্বে গণমাধ্যমের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সংঘাত নতুন নয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সিএনএন সাংবাদিক ক্রিস্টেন হোমসের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় কিংবা ট্রাম্পপন্থী সাংবাদিকদের অতি-প্রশংসামূলক প্রশ্ন বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছে। ক্ষমতাবানেরা সাংবাদিকদের ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বা ‘ভুয়া’ আখ্যা দিলেও প্রশ্ন করার কারণে কাউকে হত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয় না।

ন্যায়বিচার বনাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

​আইনের শাসনের মূল নীতি হলো—অভিযোগ উঠলে তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে। সাংবাদিক যদি প্রত্যক্ষভাবে হত্যায় অংশ নেন, অস্ত্রের জোগান দেন বা সুনির্দিষ্ট অপরাধের ষড়যন্ত্র করেন, তবে প্রচলিত আইনে তার বিচার নিশ্চিত হোক। কিন্তু তিনি কোন দলের অনুসারী ছিলেন, সংবাদ সম্মেলনে কী প্রশ্ন করেছিলেন কিংবা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিলেন কি না—তা দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় প্রমাণ করা যায় না।

​ক্ষমতার পালাবদলে সরকারের চরিত্র বদলায়, কিন্তু সাংবাদিকের প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হলে পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সমাজের জবাবদিহিতা ভেঙে পড়ে। অপরাধের প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে পেশাগত সাংবাদিকতাকে ফৌজদারি অপরাধ থেকে আলাদা রাখাই এখন আইনের শাসনের প্রধান পরীক্ষা।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট