
বিচারকদের আবাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ৬৪ জেলা ও ৮ মহানগরে আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগনিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তা:৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
বিচারকদের আবাসন সংকট কেবল থাকার জায়গার অভাব নয়, এটি সরাসরি তাদের নিরাপত্তা ও বিচারিক স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসন এবং বিচারকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৮টি মহানগরে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য আধুনিক ও সমন্বিত আবাসিক ভবন নির্মাণের যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের স্থান নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করতে দেশের সব জেলা ও দায়রা জজ এবং গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের পরিকল্পনা ইউনিট।
স্থান নির্বাচনে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা
গত ২ সেপ্টেম্বর ‘৬৪ জেলা এবং ৮টি মহানগরের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের স্থান নির্বাচন’ শীর্ষক চিঠিটি পাঠানো হয়। চিঠিতে জেলা ও দায়রা জজদের তাদের আওতাধীন আদালত প্রাঙ্গণে বা পুরাতন কোর্ট/মুন্সেফ কোর্ট প্রাঙ্গণে থাকা জায়গার বর্ণনা ও স্থানিক নকশা পাঠাতে বলা হয়েছে। নিজস্ব জায়গা পর্যাপ্ত না থাকলে জেলা জজ আদালত ভবনের এক কিলোমিটারের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দিতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে।
ভাড়া বাসায় নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নতুন প্রকল্পের রূপরেখা
মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, বর্তমানে প্রতিটি জেলায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং বিভিন্ন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন স্তরের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ জন বিচারক কর্মরত রয়েছেন। কয়েকটি জেলা ছাড়া অধিকাংশ স্থানেই বিচারকদের জন্য পর্যাপ্ত সমন্বিত সরকারি আবাসন ব্যবস্থা নেই। স্পর্শকাতর মামলা পরিচালনা করা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করায় বিচারক ও তাদের পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এই সংকট কাটাতে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রতিটি জেলা ও মহানগরে স্থানভেদে ১০ থেকে ১৫ তলাবিশিষ্ট আধুনিক আবাসিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব ভবনে সিসিটিভি, সুনির্দিষ্ট প্রবেশপথ এবং সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে, যা বিচারকদের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
সাবেক বিচারকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
আইন মন্ত্রণালয়ের এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সাবেক বিচারকরা। সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আবাসন মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। বিচারকদের কাজ অত্যন্ত কঠিন ও দায়িত্বপূর্ণ। অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত তাদের রায়ের কাজ করতে হয়। ভাড়া বাসায় থাকাটা মোটেও নিরাপদ নয়।’
ভাড়া বাসায় বসবাসের বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ভাড়া বাসায় থাকলে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়, তদবির-তদারকের সুযোগ থাকে এবং শত্রুতা বা চুরির আশঙ্কা বাড়ে। এমনকি বাড়িওয়ালার মামলা-মোকদ্দমা থাকলেও অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা তৈরি হতে পারে।’
সমন্বিত সরকারি আবাসনের সুফল সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘সব বিচারক যদি এক জায়গায় সরকারি কোয়ার্টারে একসঙ্গে থাকেন, তাহলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও মতবিনিময়ের সুযোগ বাড়বে। যাতায়াতের সমস্যা কমবে এবং আদালতের কাছাকাছি হলে অনেকেই হেঁটে যাতায়াত করতে পারবেন। বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমরাও এই আবাসনের নিশ্চয়তার দাবি জানিয়ে এসেছিলাম।’
মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিচার বিভাগের বর্তমান আবাসন সংকট নিরসনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের বর্ধিত চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।