
বিচারক শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্মকর্তাকে খাসকামরায় ডেকে মারধরের অভিযোগের ঘটনায় ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তা | ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর বিচারক শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্মকর্তাকে খাসকামরায় ডেকে মারধরের অভিযোগের ঘটনায় ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অসদাচরণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কেন বিচারক শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এ বিষয়ে সাত দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিচার চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের একটি প্রতিনিধি দল। সংগঠনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম ডাবলুসহ ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দলে ছিলেন ভুক্তভোগী ঢাকা রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আলী।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিনিধি দলটি মন্ত্রীর কাছে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে বিচারক শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। আইনমন্ত্রী বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে শুনে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু নিষ্পত্তির আশ্বাস দেন।
পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ ও পদ্মা সেতুগামী শহরতলী রেলওয়ের প্ল্যাটফর্মে দায়িত্ব পালনকালে এসআই মোহাম্মদ আলী ও অন্য পুলিশ সদস্যরা আদালত-১০-এর পিয়ন সাকিব আল হাসানের ব্যাগ তল্লাশি করতে চান।
পুলিশের ভাষ্য, সাকিব ব্যাগ তল্লাশিতে বাধা দেন এবং দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে তাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার জন্য রেলওয়ে থানায় নেওয়া হয়। সেখানে প্রথমে নিজের পরিচয় না দিলেও পরে তিনি আদালতের পিয়ন হিসেবে পরিচয় দেন। বিচারকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি সেখানেই নিষ্পত্তি করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
এসআই মোহাম্মদ আলীর অভিযোগ, থানা থেকে বের হওয়ার সময় সাকিব তাকে ‘আদালতে দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে তিনি একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
এরপর গত ৩১ আগস্ট তাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে তলব করেন ঢাকা রেলওয়ে থানার আমলী আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় বিষয়টি বিচারক শাহিদুল ইসলামের সঙ্গে মীমাংসা করে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পুলিশের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার দুপুরে এসআই মোহাম্মদ আলী বিচারক শাহিদুল ইসলামের আদালতে গেলে তাকে খাসকামরায় নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি মোবাইল ফোন হাতে অবস্থান করছিলেন। পরে বিচারকের স্টাফসহ আরও কয়েকজন সেখানে উপস্থিত হন এবং দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এসআই মোহাম্মদ আলীর দাবি, একপর্যায়ে আদালতের একজন ওমেদার পেছন থেকে তাকে আঘাত করে এবং এলোপাতাড়ি মারধর করেন। পুরো ঘটনাটি সেখানে থাকা একজন ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ধারণ করেন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ঘটনার সময় বিচারক তাকে ধমক দেন। নিজের কোনো আচরণে বিচারক ক্ষুব্ধ হয়ে থাকলে তিনি ক্ষমা চাওয়ার কথাও বলেন। তবে তার অভিযোগ, বিষয়টি আমলে না নিয়ে বিচারকের পিয়ন সাকিবের বক্তব্যের ভিত্তিতে তাকে মারধর ও অপমান করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিচারক শাহিদুল ইসলামের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে পুলিশের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আদালতের পিয়ন সাকিব আল হাসান। তার দাবি, কমলাপুরে ট্রেন থেকে নামার সময় একজন কনস্টেবলসহ কয়েকজন তার কাঁধে থাকা ব্যাগে হাত দেন। তিনি তাদের সামনে ব্যাগ তল্লাশির অনুরোধ করেন। পরে নিজেকে আদালতের স্টাফ হিসেবে পরিচয় দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সাকিবের পাল্টা অভিযোগ, বিষয়টি জানাতে রেলওয়ে থানায় গেলে এসআই মোহাম্মদ আলী তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন এবং বিচারকের সঙ্গে ফোনে খারাপ ব্যবহার করেন।
একই ঘটনার বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। একদিকে এসআই মোহাম্মদ আলী খাসকামরায় ডেকে নিয়ে তাকে মারধরের অভিযোগ করেছেন, অন্যদিকে আদালতের পিয়ন সাকিব আল হাসান পুলিশের বিরুদ্ধে তাকে মারধরের পাল্টা অভিযোগ করেছেন।
এ অবস্থায় আইন মন্ত্রণালয়ের শোকজ এবং পরবর্তী
। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি কতটা ছিল—তা স্পষ্ট হওয়ার কথা।
আইন মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগকে বিচারাঙ্গনে জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।