
সরকারি প্রকল্পে রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে ঠিকাদারদের তথ্য চেয়েছে এনবিআর
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ১৬ আগষ্ট ২০২৬
এর অংশ হিসেবে এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) যেসব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও অধিদপ্তর বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তাদের কাছ থেকে চলমান প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে।
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করা ঠিকাদাররা যথাযথভাবে ভ্যাট ও কর পরিশোধ করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে বড় পরিসরে অনুসন্ধান শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এর অংশ হিসেবে এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) যেসব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও অধিদপ্তর বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তাদের কাছ থেকে চলমান প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে।
সম্প্রতি সিআইসি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রধান প্রকৌশলীর কাছে এ ধরনের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
চিঠিতে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের নাম, প্রকল্পের ধরন, উন্নয়ন সহযোগী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, প্রতিষ্ঠানের বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন), ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন), প্রকল্পের মোট ব্যয় এবং প্রকল্প শুরুর তারিখসহ বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন সিআইসির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রকিব। পরে সওজ তাদের আওতাধীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জরুরি ভিত্তিতে এসব তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।
সওজকে পাঠানো চিঠিতে সিআইসি বলেছে, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ঠিকাদাররা যথাযথভাবে সরকারি রাজস্ব জমা দিচ্ছেন না। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই প্রকল্প ও ঠিকাদারভিত্তিক তথ্য চাওয়া হয়েছে।
ফলে শুধু প্রকল্পের আর্থিক আকার নয়, কোন ঠিকাদার কোন প্রকল্পে কাজ করছেন এবং তাদের কর ও ভ্যাট নিবন্ধনের তথ্যও মিলিয়ে দেখবে রাজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাটি।
চিঠিতে সিআইসি বলেছে, ‘এ দপ্তরে প্রাপ্ত গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের ঠিকাদাররা যথাযথভাবে সরকারি রাজস্ব জমা প্রদান করছেন না।’ এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী তথ্য দিতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৮২ অনুযায়ী সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
এনবিআরের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে অন্তত আট ধরনের তথ্য দিতে হবে। এগুলো হলো—প্রকল্পের নাম, প্রকল্পের ধরন, উন্নয়ন সহযোগীর নাম, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকাদারের বিআইএন ও টিআইএন, প্রকল্পের মোট ব্যয় এবং প্রকল্প শুরুর তারিখ। প্রকল্পের ধরন হিসেবে সরকারি অর্থায়ন, বৈদেশিক সহায়তা বা অর্থায়নের অন্যান্য উৎসও উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
সিআইসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, সেই তথ্যের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিআইএন ও টিআইএন মিলিয়ে দেখলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের ভ্যাট ও আয়কর-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে।
অর্থাৎ, উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে কি না, সেটিই অনুসন্ধানের অন্যতম মূল বিষয়।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এনবিআরের উদ্যোগটিকে গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিলম্বিত পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, “এ উদ্যোগ আরও অনেক আগেই নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে ঠিকাদারদের ভ্যাট ও কর পরিশোধ যাচাইয়ের এই উদ্যোগ যথেষ্ট শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের উদ্বেগজনক কর-জিডিপি অনুপাতের সমস্যা মোকাবিলা ও প্রতিরোধের উপায় চিহ্নিত করতে এটি সহায়ক হতে পারে।”
তবে তিনি বলেন, যথাযথ তদন্তে ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের কর, ভ্যাট ও শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে এনবিআরের ভেতরের অসাধু ব্যক্তিদের যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া গেলে এনবিআর নিজস্ব অসাধু চক্রের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে কতটা আগ্রহী হবে, সেটিই দেখার বিষয়।
শুধু সওজ নয়, অবকাঠামো খাতজুড়ে নজর
সিআইসি সূত্র জানিয়েছে, একই ধরনের তথ্য সরকারের অন্যান্য দপ্তরের কাছেও চাওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), বাংলাদেশ রেলওয়ে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং এসব মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সরকারের উন্নয়ন বাজেটের বড় একটি অংশ সড়ক, সেতু, রেলপথ, স্থানীয় অবকাঠামো, নৌপথ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যয় হয়। এসব প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল অর্থ পরিশোধ করা হয়। এখন সেই অর্থের বিপরীতে ঠিকাদাররা যথাযথভাবে কর ও ভ্যাট পরিশোধ করছেন কি না, তা যাচাই করতে চাইছে এনবিআর।
বিশেষ করে প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদারের পরিচয় এবং কর-ভ্যাট নিবন্ধনের তথ্য একসঙ্গে চাওয়ায় প্রকল্পভিত্তিক রাজস্ব হিসাবের সঙ্গে ঠিকাদারদের দাখিল করা কর ও ভ্যাটের তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চাপের মধ্যেই সিআইসি এ অনুসন্ধান শুরু করেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় হবে, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এনবিআর ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। একই সময়ে সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। যদিও আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ১০ দশমিক ০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সব ধরনের ফাঁকি বন্ধে তৎপরতা বাড়াচ্ছে এনবিআর।
এনবিআরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়করের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে উৎসে ও অগ্রিম করের মাধ্যমে। আর উৎসে ও অগ্রিম আয়করের প্রায় ২২ শতাংশ আসে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের সময় কেটে রাখা উৎসে কর থেকে।
তবে এই ২২ শতাংশকে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে এনবিআরের বার্ষিক রাজস্ব হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ ঠিকাদারি ও সরবরাহ ব্যবসার সব লেনদেন সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়।