
সাংবাদিক গ্রেফতার আর কত? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কি কেবল কাগজে-কলমে!
সম্পাদকীয়
মোহাম্মদ এনামুল হক
সম্পাদক, আদালত বার্তা
৭ আগস্ট ২০২৬
দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য উদঘাটন ও প্রকাশ করা একজন সাংবাদিকের পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—কোনো দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেই সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের বিরুদ্ধে শুরু হয় চাপ, হুমকি, মামলা, এমনকি গ্রেফতার।
প্রশ্ন হচ্ছে—সাংবাদিক কি অপরাধী, নাকি জনগণের জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার একজন প্রতিনিধি?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের “চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা” এবং “সংবাদপত্রের স্বাধীনতা” নিশ্চিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক হিসেবে স্বীকৃত; ফলে জনগণের তথ্য জানার অধিকার গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-ও রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে শক্তিশালী করেছে।
অন্যদিকে প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪ সাংবাদিকতার নৈতিকতা, জবাবদিহিতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রদান করেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোনো সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়ার পরিবর্তে সরাসরি ফৌজদারি মামলা—বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা (বর্তমানে সংশোধিত সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩) কিংবা দণ্ডবিধির মানহানির ধারা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার এই অপপ্রয়োগ শুধু সাংবাদিকদের জন্য ভীতিকর নয়; এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন—বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)-এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ—মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যেখানে তথ্য সংগ্রহ, গ্রহণ ও প্রচারের স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমকে “চতুর্থ স্তম্ভ” বলা হয়। এই স্তম্ভ দুর্বল হয়ে পড়লে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অযথা মামলা ও গ্রেফতার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করে, যার ফলে দুর্নীতিবাজ চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং রাষ্ট্র ও জনগণ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমে ব্যাখ্যা চাওয়া, সংশোধনের সুযোগ দেওয়া, নোটিশ প্রদান এবং প্রেস কাউন্সিল বা সমজাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। গ্রেফতার বা ফৌজদারি মামলা সেখানে চূড়ান্ত ও ব্যতিক্রমধর্মী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশেও এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিলকে অধিক কার্যকর ও শক্তিশালী করা, তদন্ত প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের আগে একটি স্বাধীন যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা সময়ের দাবি।
এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন—যাতে সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সংবাদকর্মী হয়রানির শিকার না হন। একইসঙ্গে সাংবাদিকদেরও পেশাগত নৈতিকতা, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে হবে—কারণ স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিতাও অবিচ্ছেদ্য।
প্রশ্ন রয়ে যায়—কোনো সংবাদ যদি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর হয়, তবে তার প্রতিকার কি তথ্যপ্রমাণ ও আইনি ব্যাখ্যার মাধ্যমে হবে, নাকি সাংবাদিককে গ্রেফতার করে?
সাংবাদিকের কলমকে হাতকড়া পরানো যায় না। ইতিহাস
সাক্ষী—সত্যকে সাময়িকভাবে দমন করা গেলেও কখনো পরাজিত করা যায় না। সংবাদপত্র সমাজের আয়না; আয়নায় প্রতিফলিত বাস্তবতা পছন্দ না হলে আয়না ভাঙলে সত্য পরিবর্তিত হয় না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৪ নাগরিকের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার স্বীকৃতি দেয়। প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪-এর ধারা ১৩ অনুযায়ী সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রথমত কাউন্সিলের মাধ্যমে নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে তা উপেক্ষিত হচ্ছে। বরং সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৫ ও ২৯, এবং দণ্ডবিধির ৪৯৯/৫০০ ধারা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার বাড়ছে—যা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের চেতনার পরিপন্থী।
সাংবাদিক গ্রেফতার আর কত? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কি কেবল কাগজে-কলমে—নাকি বাস্তবেও তা নিশ্চিত করা হবে? এখনই সময় এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার।