বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২২ পূর্বাহ্ন
Title :
হঠাৎ আলোচনায় সমকামিতা: বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিচারিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিচারকক্ষে মিডিয়ার প্রবেশে বাধা দেওয়া সংবিধান লঙ্ঘন: এলআরএফের অবস্থান কর্মসূচিতে সাংবাদিক নেতারা বাংলাদেশের রাজস্ব আয়-ব্যয়ে আরও স্বচ্ছতা চায় যুক্তরাষ্ট্র নন প্র্যাকটিসিং ও দ্বৈত পেশায় যুক্ত আইনজীবীদের সনদ বাতিলের দাবিতে বার কাউন্সিলে আইনি নোটিশ আখেরি চাহার সোম্বা: ইসলামী শরিয়তে এর অবস্থান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সরকারি খরচে বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা দরিদ্র ও অসহায় বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপিতে শূন্য হবে গুরুত্বপূর্ণ দুই পদ, বদল আসতে পারে মন্ত্রিসভাতেও সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা (ADR) কার্যক্রম শুরু: বিচারপ্রার্থীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত চার কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা: অ্যাম্বুলেন্সে আদালতে ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা হাইকোর্টের ৫৫টি বেঞ্চ পুনর্গঠন করলেন প্রধান বিচারপতি।

হঠাৎ আলোচনায় সমকামিতা: বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিচারিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

  • প্রকাশিত: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিবেদন

হঠাৎ আলোচনায় সমকামিতা: বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিচারিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

আদালত বার্তা ডেস্ক

ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২৬

​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলে সম্প্রতি দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ ওঠার পর প্রশাসন কর্তৃক তাঁদের আসন বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আইন ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শৃঙ্খলাবিধিতে ‘সমকামিতা’ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারা না থাকা এবং জাতীয় আইনি কাঠামোতেও বিষয়টি সরাসরি সংজ্ঞায়িত না থাকায় প্রশাসনিক ও আইনি প্রয়োগের জায়গাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন: ৩৭৭ ধারা ও ‘প্রকৃতির নিয়ম’

​সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আইনি গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘সমকামিতা’ শব্দটিকে সরাসরি সংজ্ঞায়িত করা বা উল্লেখ করা হয়নি। তবে ১৮৬০ সালের ব্রিটিশ আমলের ‘দ্য পেনাল কোড’-এর ৩৭৭ ধারায় ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে’ শারীরিক সম্পর্ক বা ‘আন-ন্যাচারাল অফেন্সেস’ (Unnatural Offences)-এর আওতায় বিষয়টিকে বিচারিক কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে।

পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারার সারসংক্ষেপ:

কোনো ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী বা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

 

​আইনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই অপরাধটি সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্কের স্থানে কেবল অনুপ্রবেশ (Penetration) ঘটাই আইনত যথেষ্ট বলে গণ্য হয়। ঘটনার পরিস্থিতি ও আনুষঙ্গিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আদালত সাজার পরিমাণ নির্ধারণ করে থাকেন।

আইনি জটিলতা, ২৯০ ধারা ও বিচারিক বাস্তবতা

​বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় সমকামিতাকে সরাসরি স্বীকৃতি যেমন দেওয়া হয়নি, তেমনি ‘সমকামিতা’ শব্দবন্ধ দিয়ে পৃথক কোনো অপরাধও সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।

  • বলাৎকার ও ৩৭৭ ধারা: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বয়স্কদের মধ্যে পরস্পরের সম্মতিতে সংঘটিত সমকামিতার দায়ে দণ্ডিত হওয়ার নজির বিরল। অতীতে ৩৭৭ ধারায় মূলত জোরপূর্বক বলাৎকারের মামলা হতো। তবে বর্তমানে বলাৎকারকে পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’-এর আওতায় বিচার করা হয়।
  • ২৯০ ধারার ব্যবহার: সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় পুলিশ ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের অভিযোগ পেলে দণ্ডবিধির ২৯০ ধারায় (জনউপদ্রব বা Public Nuisance) অশালীনতা বা বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগে চালান করে থাকে, যেখানে মূলত স্বল্পমেয়াদি সাজা বা জরিমানার বিধান রয়েছে।

সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক মানচিত্র

​বাংলাদেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে সমলিঙ্গের সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত। সামাজিক এই কাঠামোর কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ জাতীয় ঘটনা প্রকাশ্যে এলে প্রশাসনিক বা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদ থেকেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে দেখা যায়।

​আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক আইনি পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়:

  • আঞ্চলিক অবস্থা: পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই ও শ্রীলঙ্কায় এখনও ব্রিটিশ আমলের এই ৩৭৭ ধারার অনুরূপ আইন বজায় রয়েছে।
  • ভারতের রায় (২০১৮): বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে ৩৭৭ ধারার প্রয়োগ শিথিল করে সম্মতিক্রমে সমকামিতাকে অপরাধমুক্ত ঘোষণা করে, যদিও সেখানে সমলিঙ্গের বিয়ের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
  • এশিয়ার অগ্রগতি: নেপাল এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে সমলিঙ্গের বিয়েকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে তাইওয়ান ও থাইল্যান্ডেও সমলিঙ্গের বিয়ে আইনি বৈধতা লাভ করে।

​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের সাম্প্রতিক ঘটনাটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাবিধি এবং দেশের মূল আইনের স্পষ্টতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। আইনি প্রথা, মানবাধিকার এবং সামাজিক মূল্যবোধের এই টানাপোড়েনে আগামী দিনে বিচারিক ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা কীভাবে রূপ নেয়—তা-ই এখন দেখার বিষয়।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট