আঁধার পেরিয়ে আলো: উনিশ শতকের ঢাকায় সড়কবাতির ইতিকথা
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তাঃ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বর্তমান সময়ের ঝলমলে ঢাকা শহরের দিকে তাকালে বোঝার উপায় নেই, একসময় সূর্যাস্তের পরই গোটা শহর ডুবে যেত ঘুটঘুটে অন্ধকারে। ঢাকার রাস্তায় প্রথম সড়কবাতি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল আজ থেকে দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, ১৮৬৯ সালে। কেরোসিনের ধোঁয়াটে আলো থেকে আধুনিক বিদ্যুতের আলোয় ঢাকার রাজপথ আলোকিত হওয়ার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও চমকপ্রদ ইতিহাস।
উন্নয়নের প্রথম রূপরেখা ও নবাব আবদুল গণির ভূমিকা
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির সভাপতি ও ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ গ্রাহামের নির্দেশে সিভিল সার্জন ড. হেনরি কাটক্লিফ ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন ও সার্বিক উন্নয়ন বিষয়ক একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। এই ঐতিহাসিক রিপোর্টেই প্রথমবারের মতো ঢাকার রাস্তায় সড়কবাতি স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে কাটক্লিফ ব্যয়বহুল গ্যাস বাতির বদলে কেরোসিন বাতি জ্বালানোর পক্ষে মত দেন।
রিপোর্টটি দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গণি মন্তব্য করেছিলেন, "এ রিপোর্ট বাস্তবায়িত হলে ঢাকা স্বর্গে পরিণত হবে।" তবে বাস্তবতার নিরিখে তিনি এও স্মরণ করিয়ে দেন যে, ঢাকার সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল নয়, তাই নগর উন্নয়নে তাদের পক্ষে বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদান দেওয়া একপ্রকার অসম্ভব। সাধারণ মানুষের অপারগতার কথা ভেবে নবাব নিজেই উদ্যোগী হন। নিজস্ব অর্থায়নে ১৮৭০ সালে তিনি ঢাকায় একটি 'গ্যাস লাইট ফ্যাক্টরি' স্থাপন করেন।
রানী ভিক্টোরিয়ার সম্মানার্থে সড়কবাতি স্থাপন
ঢাকার রাজপথে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় পরিসরে সড়কবাতি স্থাপনের সুযোগ আসে ১৮৭৭ সালে। সে বছর রানী ভিক্টোরিয়াকে 'ভারতসম্রাজ্ঞী' ঘোষণা করা হলে ব্রিটিশ সরকার তা উদযাপনের জন্য দেশজুড়ে নানা প্রকল্প হাতে নেয়। এই উপলক্ষে ঢাকায় বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে একটি নাগরিক কমিটি গঠিত হয়। কমিটির উদ্যোগে সদস্যদের নিজস্ব চাঁদায় ৬,৫০০ টাকার একটি বড় তহবিল গঠন করা হয়।
সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, ওয়াইজঘাটে অবস্থিত তৎকালীন মিউনিসিপ্যালিটি অফিস থেকে শুরু করে চকবাজার পর্যন্ত ১০০টি কেরোসিনের সড়কবাতি স্থাপন করা হবে। শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকার রাস্তায় ৬০টি কেরোসিন ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়, যা রাতের ঢাকার চেহারাই বদলে দেয়।
‘বাতিওয়ালা’ পেশার উদ্ভব ও চ্যালেঞ্জ
সেই যুগে সড়কে আলো ছড়াতে কেরোসিনের বাতিই ছিল নগরবাসীর মূল ভরসা। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই বাতির কাচ পেরিয়ে বাতাস ঢুকে আলো নিভে যেত এবং রাস্তায় নেমে আসত ভুতুড়ে অন্ধকার।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই বাতিগুলো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে জ্বালানো ও নেভানোর জন্য উনিশ শতকের ঢাকায় 'বাতিওয়ালা' নামে সম্পূর্ণ নতুন এক পেশাজীবী সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। সন্ধ্যা নামলেই কাঁধে বড় বড় মই নিয়ে শহরের রাস্তায় এই বাতিওয়ালাদের ব্যস্ত পদচারণা দেখা যেত। তারা মই বেয়ে উঠে সযতনে বাতির কাচ পরিষ্কার করতেন এবং আলো জ্বালাতেন।
বৈদ্যুতিক আলোর যুগে প্রবেশ
বিশ শতকের শুরুতে ঢাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ আসার পরও দীর্ঘসময় ধরে কেরোসিন বাতির প্রচলন টিকে ছিল। নতুন প্রযুক্তির সাথে পুরনো প্রযুক্তির এই সহাবস্থান চলে কয়েক দশক ধরে। ১৯৩৫ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেই সময়ও ঢাকার রাস্তায় ৮৬৯টি কেরোসিন বাতি নিয়মিত জ্বালানো হতো, যার পাশাপাশি আধুনিক ১,০৬৬টি বৈদ্যুতিক সড়কবাতিও পথচারীদের আলো দেখাত।
কালের বিবর্তনে আজ ঢাকার প্রতিটি সড়ক ও অলিগলি অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক ও এলইডি আলোয় ঝলমল করছে। বাতিওয়ালাদের সেই বড় মই আর কেরোসিন বাতির ধোঁয়াটে আলো এখন কেবলই নগরীর এক ধূসর কিন্তু গৌরবময় ইতিহাস।