
আদালত বার্তা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
ঢাকা: আইনজীবী না হয়েও পেশাদার আইনজীবীর সিল-স্বাক্ষর জাল করে জাল দলিল তৈরি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে রতন কুমার দে (৪৫) নামের এক ভুয়া আইনজীবীকে আটক করেছে ঢাকা আইনজীবী সমিতি। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রতারণার ফলে অপরাধ না করেও জাল দলিলের মামলায় ফেঁসে যাচ্ছেন মূল সিলের স্বত্বাধিকারী বিজ্ঞ আইনজীবীরা।
সম্প্রতি ঢাকা আইনজীবী সমিতির পরিচালিত ‘টাউট উচ্ছেদ’ অভিযানের অংশ হিসেবে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে হাতেনাতে আটক করা হয় প্রতারকচক্রের এই সক্রিয় সদস্যকে।
আটকের পর দায় স্বীকার ও কোতোয়ালি থানায় মামলা
ঢাকা আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা যায়, আটকের সময় অভিযুক্ত রতনের কাছ থেকে বেশ কিছু সন্দেহজনক জাল কাগজপত্র ও দলিল জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আইনজীবী পরিচয়ে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের প্রতারিত করা এবং আসল আইনজীবীর নাম-সিল জালিয়াতির বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন।
পরবর্তীতে তদন্তের স্বার্থে সমিতির তলবে হাজির হওয়ার শর্তে মুচলেকা রেখে তাঁকে সাময়িক ছাড় দেওয়া হলেও, ঢাকা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সমিতির প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল খায়ের বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় দণ্ডবিধির প্রতারণা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন।
অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট সানাউল হক জানান, আদালত অঙ্গনে বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের আস্থা রক্ষা এবং আইনজীবীদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের প্রতারকচক্রের ওপর নজর রাখছিলেন। নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ফাঁদ পেতে রতন কুমার দে-কে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদকালে ভুক্তভোগী আইনজীবী স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন এবং প্রতারক নিজের কৃতকর্মের বিস্তারিত বিবরণ দেন।
অন্যের পাপে আসল আইনজীবী কাঠগড়ায়: ভুক্তভোগীর বয়ান
মামলার নথি ও এজাহার পর্যালোচনায় দেখা যায়, রতন কুমার দে প্রকৃত আইনজীবী না হয়েও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট এ এম শাহাবুদ্দিন সিহাবের নাম ও সিল হুবহু নকল করে একাধিক জাল দলিল তৈরি করেন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালে। শ্যামপুরের তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার খালিদ মোহাম্মদ বিন আসাদ বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় একটি প্রতারণা ও দলিল জালিয়াতির মামলা দায়ের করেন। সেখানে অজ্ঞাতনামা আসামিদের পাশাপাশি অ্যাডভোকেট এ এম শাহাবুদ্দিন সিহাবকেও অন্যতম আসামি করা হয়। নিজের অজান্তেই ফৌজদারি মামলায় নাম আসায় চরম পেশাগত ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন তিনি।
ভুক্তভোগী আইনজীবী শাহাবুদ্দিন সিহাব জানান, "দলিল জালিয়াতি বা তৈরির সঙ্গে আমার দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না। প্রতারক রতন অসদুপায়ে আমার সিল বানিয়ে এই অপকর্ম করেছে। পরবর্তীতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নিরপেক্ষ তদন্তে প্রতারক রতনের সম্পৃক্ততা শনাক্ত করে এবং আমাকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে।"
তবে ভোগান্তি এখানেই শেষ হয়নি। ধানমণ্ডি থানা এলাকার একটি ফ্ল্যাট সংক্রান্ত জালিয়াতির ঘটনায় দায়েরকৃত আরেকটি ফৌজদারি মামলায়ও একইভাবে তাঁর নাম জড়িয়ে দেওয়া হয়। পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটন করে। ধানমণ্ডি থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই’র পরিদর্শক সঞ্চয় সরকার জানান, তদন্ত শেষে বিজ্ঞ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যা গ্রহণের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
আদালত অঙ্গনে টাউট ও ভুয়া আইনজীবীদের দৌরাত্ম্য বিচার প্রশাসন এবং লিগ্যাল প্রফেশনের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। এ ঘটনাটি দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে এনেছে:
ঢাকা বারের এই অভিযানকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি বিজ্ঞ আইনজীবীদের নিজেদের ব্যবহৃত সিল ও স্বাক্ষরের সুরক্ষায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।