
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তাঃ৮অক্টোবর ২০২৬।
ঢাকা: সন্তানের রক্তাক্ত নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়েও ডুকরে কাঁদার সুযোগ পাননি এক মা। উল্টো শুনতে হয়েছে লাশ গুম করে দেওয়ার মতো ভয়ংকর হুমকি। জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ ১৪ বছরের কিশোর মো. ইমনের মা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে এমন লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক সাক্ষ্য দিয়েছেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে জুলাই গণহত্যার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে ৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি প্রদান করেন। নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রাইব্যুনাল এই সাক্ষীর নাম-পরিচয় গোপন রেখেছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
'কেন আন্দোলনে যাবো না?'
আদালতে দেওয়া জবানবন্দি থেকে জানা যায়, অভাবের সংসারে জীবিকা নির্বাহের জন্য রিকশা চালাত ১৪ বছরের কিশোর ইমন। গত ১৯ জুলাই মা তাকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু শহীদ ইয়ামিনের একটি ভিডিও মাকে দেখিয়ে সে বলেছিল, ‘দেখছো, আমার বয়সী ছেলেদের কীভাবে মেরে ফেলছে! আমি কেন আন্দোলনে যাবো না?’
পরদিন ২০ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে দুই বন্ধুকে নিয়ে রাজধানীর পান্থপথের তেঁতুলতলা মোড়ে আন্দোলনে যায় ইমন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে খবর আসে ইমন গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
চারদিক থেকে ছুটে আসছিল গুলি
খবর পেয়ে ইমনের মা, বাবা ও বড় ভাই তেঁতুলতলা মোড়ে ছুটে যান। ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ইমনের মা জানান, সেসময় চারদিক থেকে এমনকি ওপরের দিক থেকেও বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়া হচ্ছিল। তেঁতুলতলা মোড়ে পৌঁছে তারা দেখেন ইমনের নিথর দেহ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মাথার পেছনের খুলিতে এবং বুকে ছিল গুলির স্পষ্ট ক্ষত। বাম গালের চামড়া গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ঝুলে ছিল। সন্তানের এমন বীভৎস অবস্থা দেখে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারান তিনি। পরে রিকশায় করে ইমনের লাশ ও তার মাকে বাসায় নেওয়া হয়।
লাশ গুমের হুমকি
জ্ঞান ফেরার পর বাসার সামনে ছেলের লাশের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই মা। কিন্তু সেই মাতমও সহ্য হয়নি তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের। ট্রাইব্যুনালে কাঁদতে কাঁদতে ইমনের মা জানান, লম্বা চুলওয়ালা স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা সেখানে এসে তাকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘লাশ পেয়েছেন, কাঁদতে পারবেন না। না হলে লাশ গায়েব করে দেবো।’ সন্তান হারানোর শোকের মাঝেও এমন হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পুরো পরিবার।
দাফনে বাধা ও লাশ নিয়ে গ্রামের পথে হয়রানি
ইমনের পরিবারের ভোগান্তি এখানেই শেষ হয়নি। এলাকায় একটি মসজিদে খাটিয়ার জন্য গেলে তাদের সেটি দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে অন্য এলাকা থেকে খাটিয়া ও গোসল করানোর লোক ডেকে আনতে হয়। রাতে অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলে সেখানেও পথে পথে চরম বাধা ও হয়রানির শিকার হতে হয়। ইমনের মা জানান, গ্রামের পথে অন্তত তিন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের আটকে দেয়। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর তারা গ্রামে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং ২১ জুলাই সকালে পারিবারিক কবরস্থানে ইমনকে দাফন করা হয়।
বিচার দাবি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে ইমনের মা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামকে সরাসরি দায়ী করেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, "আমি শুধু আমার নিরপরাধ ছেলের হত্যার বিচার চাই। সন্তান হারানোর পর আমাকে যে অমানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, আমি তারও ন্যায়বিচার চাই।"