কোটা রায়ের দুই বছর: একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত থেকে রাজনৈতিক পতনের পথে
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ০৫ জুন ২০২৬
২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এদিন হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বহালের পক্ষে রায় ঘোষণা করেন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে এটি ছিল একটি নিয়মিত বিচারিক সিদ্ধান্তের মতোই—কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, এই রায়ই হয়ে ওঠে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনাবিন্দু।
রায় ঘোষণার দিন বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক আলোড়ন সৃষ্টি না করলেও শিক্ষার্থী সমাজের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটায়। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে পুনরায় সংগঠিত হতে শুরু করেন। প্রথমদিকে এই আন্দোলনকে সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং একই সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতির অভিযোগ—বিশেষ করে আলোচিত প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ—এসব ইস্যু জনআলোচনায় প্রাধান্য পেলেও কোটা আন্দোলন ধীরে ধীরে ভেতরে ভেতরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
জুলাই মাসে এসে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। এর প্রতিবাদে পরদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার সমর্থিত কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের মাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পায় এবং দেশব্যাপী এক অস্থির পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে সাধারণ জনগণের একাংশও। আন্দোলন দমন করতে গিয়ে সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনা এবং গ্রেপ্তার—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এক পর্যায়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়কে ঘিরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় স্বীকার করেন, সরকার বা দলীয় নেতৃত্ব কেউই ধারণা করতে পারেননি যে একটি শিক্ষার্থী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের দিকে গড়াবে। এই মন্তব্যই প্রমাণ করে যে ঘটনাপ্রবাহ কতটা অপ্রত্যাশিত ছিল ক্ষমতাসীনদের কাছে।
অবশেষে ক্রমবর্ধমান আন্দোলন, সহিংসতা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন—যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোটা বহালের রায়টি কেবল একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সামাজিক অসন্তোষের একটি ট্রিগার পয়েন্ট। বেকারত্ব, বৈষম্য, প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ—এসব উপাদান একত্রে বিস্ফোরিত হয়ে একটি বৃহৎ আন্দোলনে রূপ নেয়।
দুই বছর পর ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, ৫ জুনের সেই রায় ছিল একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। এটি প্রমাণ করে, একটি নীতিগত বা বিচারিক সিদ্ধান্ত কখনো কখনো বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।
২০২৪ সালের কোটা রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি শুধু একটি আন্দোলনের সূচনা নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।