
চাকরিতে অর্জিত অধিকার ও পদোন্নতির যোগ্যতা নতুন বিধিতে বাতিল করা যাবে না: হাইকোর্ট
আদালত বার্তা প্রতিবেদক, ঢাকা:১৪ অক্টোবর ২০২৬
চাকরিতে প্রবেশের সময় কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যে আইনি অধিকার ও পদোন্নতির যোগ্যতা থাকে, পরবর্তী সময়ে প্রবিধানমালা বা বিধি সংশোধন করে তা ভূতাপেক্ষভাবে (অতীত থেকে কার্যকর দেখিয়ে) কেড়ে নেওয়া যাবে না বলে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাকরির বিধিমালা বা প্রবিধানমালা সংশোধনের পূর্ণ ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের রয়েছে। তবে, এই সংশোধনীর কারণ দেখিয়ে কোনোভাবেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগে থেকে অর্জিত আইনি সুবিধা বা অধিকার বাতিল করা যাবে না।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ১৭ পৃষ্ঠার এক পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ‘মোহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদার ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র’ রিট মামলার প্রেক্ষিতে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী এবং বিচারপতি এ. এফ. এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৯ আগস্ট এই রায় প্রদান করেন। আদালতের মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি এ. এফ. এম সাইফুল করিম।
মামলার প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই:
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে যোগদান করেন মুহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদারসহ মোট সাতজন কর্মচারী। পরে তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়। তৎকালীন ‘বারি প্রবিধানমালা, ২০১১’ অনুযায়ী, ফিডার পদে পাঁচ বছর চাকরি সম্পন্ন করার পর উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) থেকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে শতভাগ পদোন্নতির বিধান ছিল। রিটকারী সাতজন প্রকৌশলীই ২০২১ সালের আগেই এই পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
কিন্তু ২০২১ সালের ৯ মার্চ সরকার ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রবিধানমালা, ২০২১’ গেজেট আকারে প্রকাশ করে। নতুন এই প্রবিধানমালার ৩২ নম্বর ক্রমিকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে শতভাগ পদোন্নতির পরিবর্তে ৩৩ শতাংশ পদোন্নতি এবং ৬৭ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের বিধান করা হয়। অথচ ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে শতভাগ পদোন্নতির কোটা অপরিবর্তিত রাখা হয়।
অর্জিত অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর নতুন প্রবিধানমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদনকারীরা ২০২১ সালে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেছিলেন।
আদালতে যুক্তিতর্ক:
রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এস. আর. এম. লুৎফর রহমান আখন্দ। তিনি আদালতে তুলে ধরেন, ২০২১ সালের সংশোধিত প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই রিটকারীরা পদোন্নতির সব শর্ত পূরণ করে অধিকার অর্জন করেছিলেন। পরবর্তী সংশোধনের মাধ্যমে তাদের প্রতিকূলে পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত করা আইনিভাবে বেআইনি ও বৈষম্যমূলক।
অন্যদিকে, বারি’র পক্ষের আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন যুক্তি দেন যে, উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে সিভিল শাখায় বিএসসি প্রকৌশলীদের সরাসরি নিয়োগের বিধান করা হয়েছে। যেহেতু ২০১১ সালের প্রবিধানমালা রহিত করে ২০২১ সালের প্রবিধানমালা প্রবর্তন করা হয়েছে, তাই পুরনো বিধির অধীনে কেউ পদোন্নতি দাবি করতে পারেন না। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহফুজ বিন ইউসুফ ও আক্তার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।
হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত:
উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক ও নথি পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করেন, প্রবিধান সংশোধনীর আগেই যারা পদোন্নতির জন্য যোগ্য হয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে নবপ্রণীত ‘পদোন্নতি প্রবিধান, ২০২১’ ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। রিট আবেদনকারীরা পূর্ববর্তী প্রবিধানের (২০১১) অধীনে অর্জিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারের অধিকারী। পরবর্তীকালে প্রবিধানে কোনো পরিবর্তন আনার মাধ্যমে তাদের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
রায়ে হাইকোর্ট সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন যে, সংশোধিত প্রবিধান (২০২১) কার্যকর হওয়ার আগে যেসব আবেদনকারী পদোন্নতির নির্ধারিত চাকরিকাল, যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করেছিলেন, তাদের পদোন্নতির বিষয়টি পুরনো অর্থাৎ ২০১১ সালের প্রবিধানের বিধান অনুযায়ীই কঠোরভাবে বিবেচনা করতে হবে।