ছেলেকে চিকিৎসক বানাতে এসে লাশ নিয়ে ফিরছেন মা: কুমিল্লায় কাশ্মীরি শিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা:৬ নভেম্বর ২০২৬
সন্তান চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করবেন—এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে ভারতের জম্মু-কাশ্মীর থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন মা নিঘাত বেগম। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যে ছেলেকে চিকিৎসক হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর নিথর দেহ কফিনে ভরে দেশে নিয়ে ফিরতে হচ্ছে এই অসহায় মাকে।
ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কাবিলা এলাকায় অবস্থিত ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে। নিহত শিক্ষার্থীর নাম আদনান আলতাফ (২৫)। তিনি ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের বারামুল্লা এলাকার বাসিন্দা আলতাফ হোসেনের ছেলে এবং ওই মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
কলেজ প্রশাসন, পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন চূড়ান্ত পেশাগত (এমবিবিএস ফাইনাল) পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আদনান। সন্তানের পড়াশোনার পাশে থেকে সাহস ও মানসিক সমর্থন জোগাতে মা নিঘাত বেগমকেও কাশ্মীর থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। মা কলেজ ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী একটি ভাড়া বাসায় অবস্থান করছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ২ নভেম্বর (রবিবার) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে। হোস্টেল ও বাসার আশপাশ থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হন আদনান। দীর্ঘ সময় ফিরে না আসায় এবং মুঠোফোনে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে পরিবারের সদস্য ও সহপাঠীরা আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কোথাও কোনো সন্ধান না পেয়ে পরদিন ৩ নভেম্বর কলেজ কর্তৃপক্ষের সহায়তায় বুড়িচং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
নিখোঁজের তিন দিন পর, ৫ নভেম্বর (বুধবার) সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে কলেজের ছাত্রাবাসসংলগ্ন একটি গভীর পুকুরে এক যুবকের মরদেহ ভেসে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীরা। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বুড়িচং থানা-পুলিশ এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ পুকুর থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে এবং পরিবারের সদস্যরা সেটি নিখোঁজ আদনানের বলে শনাক্ত করেন।
মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ছেলের এমন আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুতে মা নিঘাত বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তাঁর বুকফাটা আহাজারিতে হাসপাতালের মর্গ প্রাঙ্গণ ও কলেজ ক্যাম্পাসে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আদনানের সহপাঠী ও শিক্ষকদের মাঝেও শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে।
কীভাবে এই মৃত্যু ঘটল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। এটি রাতের অন্ধকারে পা পিছলে পুকুরে পড়ে যাওয়ার দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ বা বিরোধ রয়েছে—তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, মরদেহের প্রাথমিক সুরতহালে দৃশ্যমান কোনো গুরুতর জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্ত ও সিআইডির ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। আইনি ও কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে কাশ্মীরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।