জুলাইয়ে বেড়েছে ধর্ষণ ও আত্মহত্যা
নিউজ ডেস্ক আদালতঃ০১ আগস্ট ২০২৬
চলতি বছরের জুন মাসের চেয়ে জুলাই মাসে দেশে ধর্ষণ ও আত্মহত্যার মতো গুরুতর অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। তবে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কমেছে। একই সময়ে অনলাইন জুয়া ও মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও মাদক ব্যবসায় পুলিশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জুলাই মাসের নারী, শিশু, মাদক ও অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত সহিংসতার মাসিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জুন ও জুলাই মাসের বিভিন্ন ঘটনার তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এমএসএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আইনজীবী সুলতানা কামালের সই
করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ৩২০টি ঘটনার বিপরীতে জুলাইয়ে এ সংখ্যা কমে ৩০৬-এ নেমেছে। জুনে ৬৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও জুলাইয়ে তা বেড়ে ৯০-এ পৌঁছেছে। একইভাবে আত্মহত্যার ঘটনা ১৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৮টি। যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনাও ২১ থেকে বেড়ে ২২টি হয়েছে। তাদের পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই মাসে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ, আত্মহত্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৬ থেকে ৭টিতে, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৫ থেকে ৩টিতে, শারীরিক নির্যাতন ৫৬ থেকে ৪২টিতে এবং হত্যার ঘটনা ৭৬ থেকে ৫২টিতে নেমে এসেছে। অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা সামান্য বেড়ে ১২ থেকে ১৩টি হয়েছে, আর এসিড নিক্ষেপের ঘটনা দুই মাসেই একটি করে ঘটেছে।
এমএসএফ বলছে, মোট ঘটনার সংখ্যা কমলেও সহিংসতার ধরন আরও জটিল ও উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে, ধর্ষণ ও আত্মহত্যার উচ্চহার নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকবিরোধী অভিযানে আটকের সংখ্যা ৩৪ থেকে বেড়ে ৯৩ হয়েছে। মাদক-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪ জন। তবে মাদক ব্যবসায় পুলিশের সম্পৃক্ততার চারটি নতুন অভিযোগ উঠে এসেছে। এমএসএফ একে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জুলাই মাসে তিনটি ফৌজদারি অপরাধ স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ধর্ষণচেষ্টার এবং একটি ধর্ষণের ঘটনা ছিল।প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে। সরকার পতন-পরবর্তী মামলায় জুলাই মাসে নতুন করে ৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে, যদিও গ্রেপ্তারের সংখ্যা কমে ১২৬-এ দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও নিহতের সংখ্যা সামান্য বেড়ে সাতজনে দাঁড়িয়েছে।এমএসএফের মতে, এ ধরনের গুরুতর অপরাধ সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত ঘটনায় জুলাই মাসে কোনো নিহত বা আহতের তথ্য না থাকলেও ১০ জনকে আটক করা হয়েছে, যেখানে জুনে কোনো আটক ছিল না। এমএসএফের মতে, এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। আইন অমান্য করে সালিশের মাধ্যমে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ মীমাংসার প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমএসএফ।
নবজাতক উদ্ধারজুলাই মাসে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১১ জন নবজাতককে উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। তাদের মধ্যে আটজন ছিল মৃত, আর তিনজন জীবিত।প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণত এসব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পুলিশ কার্যকর কোনো তদন্ত করে না। এ কারণে অপরাধীরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়। মৃত নবজাতকের ক্ষেত্রে পুলিশ সাধারণত অপমৃত্যুর মামলা করে। আর জীবিত নবজাতকদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এমএসএফের মতে, বেআইনি সালিশ ও নবজাতক পরিত্যাগের ঘটনাগুলো সমাজে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও দৃঢ় করছে।
বেড়েছে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনজুনের তুলনায় জুলাই মাসে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছে এমএসএফ। জুলাইয়ে সাংবাদিকদের ওপর ৩৬টি হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, যা গত জুনেও ছিল ১৮টি। পাশাপাশি জুলাই মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় মামলা ও গ্রেপ্তারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গুরুতর হুমকি বলে অভিহিত করেছে সংস্থাটি। এদিকে, জুলাই মাসে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছে ৩১ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে সাতজন। জুনে এই সংখ্যা ছিল ৩২