জেলা আইনজীবী সমিতিতে সদস্যভুক্তির নামে অস্বাভাবিক ফি নির্ধারণে চাপে পড়ছেন নবীন আইনজীবীরা।
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ২৫ এপ্রিল ২০২৬
জেলা আইনজীবী সমিতিতে সদস্যভুক্তির নামে অস্বাভাবিক ফি নির্ধারণে চাপে পড়ছেন নবীন আইনজীবীরা। কোনো কেন্দ্রীয় নীতিমালা না থাকায় জেলাভেদে এই ফি কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফলে পেশায় প্রবেশ করতে গিয়েই বড় আর্থিক বাধার মুখে পড়ছেন নতুনরা। একে একধরনের অনিয়ন্ত্রিত আর্থিক চাপ, এমনকি চাঁদাবাজির সঙ্গে তুলনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনজীবী হওয়ার পথ শুরু থেকেই ব্যয়বহুল। শিক্ষানবিশ হিসেবে নিবন্ধনের আগে ইন্টিমেশন জমা দেওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে দিতে হয় ১ হাজার ৮০ টাকা। এরপর রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণে প্রায় ৫ হাজার টাকা। প্র্যাকটিসের অনুমতি পেলে আবার দিতে হয় বার কাউন্সিলের বিভিন্ন ফি। এসব ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত যখন পেশার প্রবেশ দরজায় পৌঁছান নবীনরা, তখনই সামনে আসে সবচেয়ে বড় বাধা- জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যভুক্তির চাঁদা।
২০২৬ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত সনদপ্রাপ্তদের তালিকা অনুযায়ী, নতুন আইনজীবীদের ৬ মাসের মধ্যে কোনো না কোনো জেলা বারে সদস্য হতে হয়। কিন্তু এই সদস্যভুক্তির ফি নির্ধারণে কোনো কেন্দ্রীয় নীতিমালা নেই। বাস্তবতা হলো, এই সদস্যভুক্তির ফি নির্ধারণে এক জেলার সঙ্গে অন্য জেলার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। কোথাও বয়সভেদে আড়াই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে, কোথাও এক লাখের বেশি, আবার কোথাও ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার ঘরে।
সম্প্রতি কুড়িগ্রাম জেলার আইনজীবী সমিতি তাদের নতুন আইনজীবী সদস্যভুক্তির জন্য ভর্তি ফি বয়সভেদে আড়াই লাখ টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে। সিলেট জেলার আইনজীবী সমিতি তাদের নতুন আইনজীবী সদস্যভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতি প্রায় ৬২ হাজার টাকা, নীলফামারী আইনজীবী সমিতিতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা, ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ, এই সদস্যভুক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট নির্ধারিত ফি নেই; প্রত্যেকটি জেলায় নিজস্ব কাঠামোতেই চলছে এমন অপ্রত্যাশিত ফি আদায়ের মহড়া। ফলে একই পেশায় প্রবেশ করতে গিয়ে নবীনদের জন্য তৈরি হচ্ছে বৈষম্যমূলক আর্থিক চাপ।
নতুন সদস্য ভর্তির জন্য নির্ধারিত ফি নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন সদ্য বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করা আইনজীবীরা। তারা বলছেন, এটি অন্যায্য এবং একধরনের স্বেচ্ছাচারী আচরণ। এই ফি নবাগতদের প্রতিবন্ধকতা তৈরির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সদ্য পেশায় প্রবেশ করা একাধিক আইনজীবী নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানান। সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করে তাদের অধিকাংশই প্রতিদিন ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হাতখরচ পান। অনেক ক্ষেত্রে সেটিও অনিয়মিত। কোথাও কোথাও ৫০ থেকে ১০০ টাকার বেশি দেওয়ার নজিরই নেই। এই সামান্য আয়ে ন্যূনতম জীবনযাপনই কঠিন। অথচ হঠাৎ করে কয়েক লাখ টাকা জোগাড় করে তাদের পেশায় প্রবেশ করতে হয়েছে। অনেকেই পরিবার থেকে সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ সম্পদ বিক্রি করেছেন, কেউবা আবার ঋণ বা ধার করে পেশায় প্রবেশ করেছেন।
নতুন সদস্য ভর্তি ফি নিয়ে জেলা বারের সিদ্ধান্তে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নবাগতরা। তবে এ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না কেউই। এমনকি পুরোনো সদস্যরাও সমিতির সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নবাগত এক আইনজীবী বলেন, এটা নবাগতদের পথ রুদ্ধ করার শামিল। এটা একধরনের অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচারিতার শামিল। এই ভর্তি ফি অনেকের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি নিজেও জমি বন্দক রেখে টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করছি। আমরা বার কাউন্সিলের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত সংকট তৈরি করছে না, বরং পেশার মান ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে। আর্থিক চাপে পড়ে অনেক মেধাবী তরুণ আইন পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। যারা আসছেন, তাদের মধ্যেও অনেকে শুরুতেই চাপের মুখে পড়ে যাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে পেশাগত নৈতিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের মতে, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন একটি অভিন্ন নীতিমালা। সদস্যভুক্তির ফি নির্ধারণে একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, জেলাভিত্তিক বৈষম্য কমানো এবং নবীন আইনজীবীদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় তদারকি ও নির্দেশনা ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
জেলা বারে সদস্যভুক্তিতে ‘অসহনীয়’ ব্যয় প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বলেন, এটা অত্যন্ত অযৌক্তিক। আইন পেশায় বলাই হয়ে থাকে যে, প্রথম পাঁচ বছর শুধু কাজ। কোনো ইনকাম নাই। দ্বিতীয় পাঁচ বছর মানে সামান্য ইনকাম, অধিক কাজ। সে হিসেবে এটা অত্যন্ত অযৌক্তিক। এটা চাঁদাবাজির সমতুল্য। তিনি আরও বলেন, এটা বছরে ২ শতাংশের বেশি বাড়ানো উচিত নয়।