ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু
অংশীজনের মতামত, হলের পরিবেশ ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্যোগ
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলগুলোর পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের মতামত, ছাত্র সংগঠনগুলোর অবস্থান এবং অতীতের নির্বাচন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে উপাচার্যের কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে এ বিষয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, দুই উপ-উপাচার্য, প্রক্টর এবং বিভিন্ন আবাসিক হলের প্রাধ্যক্ষরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা, অতীতের নির্বাচনগুলোতে যেসব বিতর্ক ও সমস্যা দেখা দিয়েছিল সেগুলো চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধের বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে শিক্ষার্থী এবং সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর মতামত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হল পর্যায় থেকে শুরু হবে মতামত সংগ্রহ
সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে আবাসিক হলগুলোর প্রাধ্যক্ষরা নিজ নিজ হলের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বিশেষ করে সক্রিয় ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্বাচন নিয়ে মতামত সংগ্রহ করা হবে।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষার্থী এবং সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। এসব আলোচনায় নির্বাচনের পরিবেশ, ভোটারদের অংশগ্রহণ, প্রচার-প্রচারণা, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, আবাসিক হলের পরিস্থিতি এবং নির্বাচনকালীন শৃঙ্খলা—এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।
সংগৃহীত মতামত ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তফসিল এখনো চূড়ান্ত নয়
বর্তমান পর্যায়ে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল চূড়ান্ত হয়নি। ২০ আগস্টের সভাকে মূলত নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক প্রস্তুতি ও অংশীজনদের মতামত সংগ্রহের প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি শুরু হলেও তফসিল এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এর আগে ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্রুত ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল।
এদিকে ২০ আগস্টই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের জন্য তাদের প্যানেল ঘোষণা করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ফলে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে সক্রিয়তা বাড়ছে।
২০২৫ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সামনে
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নতুন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সর্বশেষ নির্বাচন ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নির্বাচনী নথিতে ২০২৫ সালের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নির্বাচনে ডাকসুর ভোটার ছিল প্রায় ৪০ হাজারের কাছাকাছি এবং ভোটার উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনের ফলাফলে বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতে নতুন মাত্রা তৈরি করে।
বর্তমান ডাকসু কমিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শেষ হওয়ার কথা। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের প্রস্তুতি শুরু করাকে ধারাবাহিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অতীতের বিতর্ক এড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ
ডাকসু বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৯ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৯০ সালের পর ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি।
২০১৯ সালের নির্বাচন ঘিরে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ, হলকেন্দ্রিক ভোট গ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক ও অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে আরও গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ করার বিষয়টি এবার প্রশাসনের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষ করে আবাসিক হলের পরিবেশ ডাকসু নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন হলের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের অধিকার ও আবাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ ও দাবি সামনে এসেছে। ফলে নির্বাচনের আগে হল পর্যায়ে মতামত গ্রহণের সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন
আলোচনা সভা শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, প্রশাসন ডাকসু নির্বাচনকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তাঁর মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরাই নির্বাচনের মূল ভোটার। এ কারণে তাদের মতামতের পাশাপাশি সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর মতামতও নেওয়া হবে। প্রথমে হলগুলোর প্রাধ্যক্ষরা নিজ নিজ হলের শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন। পরে কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষার্থী ও সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করা হবে।
উপাচার্য আরও জানান, হল পর্যায়ের আলোচনা শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে। পাশাপাশি শৃঙ্খলা পরিষদের সভা ডেকে ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। এসব আলোচনার ভিত্তিতেই ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই এখন মূল প্রত্যাশা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন হিসেবে ডাকসুর গুরুত্ব শুধু ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঐতিহাসিকভাবে ডাকসু বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি ও নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে একটি গ্রহণযোগ্য ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য শুধু তফসিল ঘোষণা যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন সবার জন্য সমান সুযোগ, নিরাপদ ভোটার পরিবেশ, নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকা, স্বাধীনভাবে প্রচার-প্রচারণার সুযোগ, আবাসিক হলের স্বাভাবিক পরিবেশ এবং নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এবারের প্রাথমিক উদ্যোগে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন’ নিশ্চিত করা। হল পর্যায় থেকে শুরু হওয়া মতামত সংগ্রহ শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর সিদ্ধান্তে রূপ নেয় এবং কবে নাগাদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়—সেদিকেই এখন নজর শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর।