দেশে উৎপাদন সম্ভব, তবুও আমদানিনির্ভরতা: লবণ খাতে সংকট, সিন্ডিকেট ও করণীয়
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ ৩০ জুন ২০২৬
বাংলাদেশে লবণ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ লবণ আমদানি করা হচ্ছে—যা একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের উপকূলীয় লবণ চাষিরা। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, নীতিগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং শক্তিশালী আমদানিকারক সিন্ডিকেটের প্রভাব—এই তিনটি কারণেই দেশের লবণ খাত কাঙ্ক্ষিত উন্নতি অর্জন করতে পারছে না।
বর্তমানে দেশে লবণের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টন। অথচ উপকূলীয় ১৯টি জেলায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বছরে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত লবণ উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লবণ রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শিল্প খাতে কাঁচামাল সংকটের অজুহাতে প্রতিবছর ভারত থেকে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার লবণ আমদানি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি শক্তিশালী আমদানিকারক সিন্ডিকেট এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। তারা তুলনামূলক কম দামে লবণ আমদানি করে দেশের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে, যার ফলে সাধারণ ভোক্তা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় উৎপাদকরা।
লবণ চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াই তাদের প্রধান সমস্যা। ভারতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে যেখানে প্রতি কেজি লবণ উৎপাদনে খরচ হয় আনুমানিক ১ টাকা, সেখানে বাংলাদেশে প্রচলিত পদ্ধতি, উচ্চ জমি ভাড়া এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৭ টাকা। এর মধ্যে জমির লিজ বাবদ ব্যয়ই মোট খরচের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি।
এ অবস্থায় আমদানিকৃত সস্তা লবণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না দেশীয় চাষিরা। ফলে অনেকেই লবণ চাষ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য ও শিল্প নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক নীতি সহায়তা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ খুব সহজেই লবণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে। এ জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে ভ্যাকুয়াম ইভাপোরেশন প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় রিফাইনারি স্থাপন, এবং সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি জমির লিজ মূল্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং চাষিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশের স্বার্থ রক্ষায় আমদানিনির্ভরতা কমাতে প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লবণ আমদানির ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বাজার তদারকি জোরদার করে সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য।
লবণ একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হওয়ায় এর বাজার স্থিতিশীল রাখা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করে, চাষিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি টেকসই ও স্বনির্ভর লবণ খাত গড়ে তোলার এখনই সময়—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।