নিউজ ডেক্স আদালত বার্তাঃ৬ নভেম্বর ২০২৬
প্রতিটি কোম্পানিতে আইনজীবী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ | আইনজীবীদের প্রশিক্ষণে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ
দেশে গত দেড় দশকে সংঘটিত সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, গুম ও হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা/মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি চিরতরে দূর করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শুক্রবার বিকেলে ঢাকা আইনজীবী সমিতি (ঢাকা বার) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘নবীন আইনজীবীদের ওরিয়েন্টেশন–২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে এসেছি, প্রতিটি অন্যায়ের বিচার হবে’
আইনমন্ত্রী বলেন, “আমরা যে পথ ধরে আজ এখানে দাঁড়িয়েছি, তা অত্যন্ত রক্তস্নাত ও পিচ্ছিল ছিল। গত ১৬ বছরের বেশি সময়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের সাড়ে চার হাজারের বেশি সহযোদ্ধাকে বিচারবহির্ভূতভাবে ক্রসফায়ারে এবং সাত শতাধিক সহযোদ্ধাকে বলপূর্বক গুমের নির্মম শিকার হতে হয়েছে। বহু পরিবার এখনো তাদের নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশায় পথ চেয়ে থাকে।”
তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে প্রায় ৬০ লাখ রাজনৈতিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা, গায়েবি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ঘটনা ঘটার ২০ বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছিল। এসব অবিচারের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, তা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল অঙ্গীকার। তিনি বলেন, “জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এবং এই দেশের মাটিতে সমস্ত অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করতে আমরা দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ।”
আইনজীবীদের কর্মসংস্থানে কোম্পানি আইন সংস্কারের প্রস্তাব
আইন পেশার প্রসারণ ও বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, “আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষায় প্রতিটি নিবন্ধিত কোম্পানিতে যেভাবে হিসাব নিরীক্ষক (অডিটর) থাকা বাধ্যতামূলক, ঠিক তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক আইনি শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রতিটি কোম্পানিতে একজন করে আইনজীবী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে কোম্পানি আইন সংশোধনের লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা চলছে।”
দক্ষতা বাড়াতে ৫০ কোটি টাকার প্রশিক্ষণ প্রকল্প
আইনজীবীদের পেশাগত মানোন্নয়ন নিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৮০ হাজার আইনজীবীর পেশাগত দক্ষতা ও মেধার বিকাশ ঘটাতে সরকার উদ্যোগী হয়েছে। এ লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নবীন ও প্রবীণ আইনজীবীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।
‘ছোট বারান্দা নয়, বড় বারান্দার আইনজীবী হোন’
নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, “ছোট বারান্দার আইনজীবী হওয়ার চেষ্টা করবেন না; সবসময় বড় বারান্দার মর্যাদাপূর্ণ আইনজীবী হতে হবে।” তিনি স্পষ্ট করেন, বিচারকদের সঙ্গে কোনো ধরনের অনৈতিক লেনদেন বা গোপন যোগাযোগের আশ্রয় নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আদালত প্রাঙ্গণে দলীয় ক্ষমতার দম্ভ ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, আদালত প্রাঙ্গণে কোনো দলীয় প্রভাব খাটবে না। বিচারকের সামনে আইনজীবীদের শুধু আইনের যুক্তি ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে হবে।
আইনজীবী সুরক্ষা আইন ও পেশাগত স্বচ্ছতা
আইনজীবীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ‘আইনজীবী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের দাবির প্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, “আইনজীবীদের পেশাগত সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়। তবে তার আগে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অধীনে আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচরণ সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালগুলোকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে হবে। গুটি কয়েকজনের অনৈতিক চর্চার কারণে গোটা আইনজীবী সমাজ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিসিএস পরীক্ষার চেয়েও কঠোর নিয়মতান্ত্রিক ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইনজীবীরা সনদ অর্জন করেন। অথচ সামাজিকভাবে তাদের অবস্থান এখনও কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়নে পৌঁছায়নি। এই মর্যাদা পুনর্গঠনে সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেবে।
অনুষ্ঠানের অন্যান্য অতিথিবৃন্দ
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন:
সমিতির সিনিয়র সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. ইলতুৎমিশ সওদাগর (এ্যানী)-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ঢাকা বারের অফিস সেক্রেটারি মো. আবজাল হোসাইন মৃধা।