নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের বদলে ২ জনের ফাঁসি বহাল, ১০ জন খালাস; ৪ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড
দ্রুত বিচার নয়, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক | আদালত বার্তা
ঢাকা, ২৪ আগস্ট ২০২৬
ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় প্রায় সাত বছর পর উচ্চ আদালতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। ২০১৯ সালে নিম্ন আদালতে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। একই সঙ্গে ১০ আসামিকে খালাস এবং চারজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের ফৌজদারি আপিল ও জেল আপিলের ওপর এ রায় ঘোষণা করেন।
হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা এবং মামলার অন্যতম আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম। বাকি ১৪ আসামির মধ্যে ১০ জনকে খালাস এবং চারজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিচারিক আদালতের রায়ে ছিল ১৬ জনেরই মৃত্যুদণ্ড
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক মো. মামুনুর রশিদ নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। মামলার রেকর্ড অনুযায়ী, মাত্র ৬১ কার্যদিবসে বিচার শেষ করে ওই রায় ঘোষণা করা হয়েছিল।
মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ায় আইন অনুযায়ী মামলার নথি মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারার অধীনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন—এই প্রক্রিয়াই ‘ডেথ রেফারেন্স’ নামে পরিচিত। ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর মামলার নথি হাইকোর্টে পৌঁছে। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।
সাত বছর পর উচ্চ আদালতে বদলে গেল রায়ের চিত্র
হাইকোর্টে মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয় ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০ আগস্ট আদালত ২৪ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার সৈয়দ এজাজ কবিরসহ আইনজীবীরা শুনানিতে অংশ নেন।
শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগের সঙ্গে আসামিদের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে খালাসের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের নথি, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী রায় দেওয়ার আবেদন জানায়।
বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও উঠল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
হাইকোর্টের আজকের রায়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক শুধু ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তন নয়; বিচারিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—সেই প্রশ্নটিও সামনে এসেছে।
আপনার দেওয়া রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেছেন, সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থতার কারণে বিচারিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট তৎকালীন ট্রাইব্যুনাল বিচারককে বিচারিক দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। তবে পূর্ণাঙ্গ রায়ের আদেশ প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এই অংশের সুনির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি ও প্রত্যাহারের ধরন সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
এখানেই নুসরাত হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি শিক্ষা সামনে আনে—দ্রুত বিচার এবং যথাযথ বিচার এক বিষয় নয়। বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা যেমন ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য, তেমনি সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়ন, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, প্রমাণের আইনগত গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রযোজ্য বিধি অনুসরণ করাও ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কীভাবে শুরু হয়েছিল নুসরাত হত্যা মামলা
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে মামলার নথি ও পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে। ৬ এপ্রিল পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে কৌশলে তাকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ নুসরাত ১০ এপ্রিল ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
নুসরাতের মৃত্যুর পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় যে মামলা করেছিলেন, সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। তদন্ত শেষে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং বিচারিক আদালতে প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
ডেথ রেফারেন্স কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কোনো নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে দণ্ড কার্যকর করা যায় না। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন। এ কারণে বিচারিক আদালতের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত হয়ে যায় না; উচ্চ আদালত মামলার নথি, সাক্ষ্য, প্রমাণ এবং আইনগত বিষয় পর্যালোচনা করে মৃত্যুদণ্ড বহাল, পরিবর্তন কিংবা বাতিল করতে পারেন।
নুসরাত হত্যা মামলায় আজকের রায় সেই সাংবিধানিক ও আইনগত সুরক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নিম্ন আদালতে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালতের বিচারিক পর্যালোচনায় শেষ পর্যন্ত মাত্র দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে।
দ্রুত নিষ্পত্তির সঙ্গে ন্যায়বিচারের ভারসাম্য
নুসরাত হত্যা মামলা শুরু থেকেই দেশব্যাপী আলোচিত ছিল। হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিচারিক আদালত রায় ঘোষণা করায় দ্রুত বিচার নিয়ে প্রশংসাও হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতে দীর্ঘ সময় ধরে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে রায়ের বড় ধরনের পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, কোনো মামলায় দ্রুত রায় দেওয়া এবং চূড়ান্তভাবে আইনসম্মত রায় নিশ্চিত করা—দুটি পৃথক বিষয়।
বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন বিচার দ্রুত হওয়ার পাশাপাশি তা নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসারে সম্পন্ন হয়।
নুসরাত হত্যা মামলার নতুন আইনি তাৎপর্য
হাইকোর্টের আজকের রায় তাই শুধু একটি বহুল আলোচিত হত্যা মামলার দণ্ড পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার মান, ডেথ রেফারেন্সের গুরুত্ব এবং নিম্ন
আদালতের রায়ের ওপর উচ্চ আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে এনেছে।
একই মামলায় নিম্ন আদালতের ১৬টি মৃত্যুদণ্ডের বিপরীতে উচ্চ আদালতে দুইটি মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারটি আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১০টি খালাস—এই পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, উচ্চ আদালতের পুনর্মূল্যায়ন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
নুসরাতের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি যেমন অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তেমনি ন্যায়বিচারের সেই প্রক্রিয়াকে অবশ্যই আইন, প্রমাণ ও নির্ধারিত বিচারিক পদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কারণ ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে শুধু রায়ের গতি নয়—রায়ের আইনগত ভিত্তি, প্রমাণের মূল্যায়ন এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাই শেষ পর্যন্ত বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নির্ধারণ করে।