পাঁচ রুটে মনোরেল পরিকল্পনা: সমীক্ষার দায়িত্বে বুয়েট, ২০২৯ সালের মধ্যে দুই রুট চালুর লক্ষ্য
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
রাজধানী ঢাকার ক্রমবর্ধমান যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেলভিত্তিক আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) পাঁচটি সম্ভাব্য মনোরেল রুট প্রস্তাব করেছে এবং এসব রুটের প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-কে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে পাঁচটি রুটের মধ্যে থেকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে দুটি রুট নির্বাচন করা হবে। সমীক্ষা, অর্থায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শেষে ২০২৯ সালের মধ্যে অন্তত দুটি মনোরেল চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডিটিসিএ কর্মকর্তারা জানান, বুয়েটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকেও সমীক্ষায় যুক্ত করা হবে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে, যাতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করবে বুয়েট। এ সমীক্ষায় সম্ভাব্য রুটগুলোর কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবহনগত কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি যাত্রীসংখ্যার পূর্বাভাস, নির্মাণ ব্যয়, বিনিয়োগ সম্ভাবনা এবং বাস্তবায়ন কৌশলও মূল্যায়ন করা হবে। এ ছাড়া সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (প্রিলিমিনারি ডিপিপি) প্রস্তুত করা হবে।
সমীক্ষা কার্যক্রম সমন্বয় করছেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, “ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও সরু সড়কবিশিষ্ট এলাকায় ভারী মেট্রোরেল নির্মাণ সব সময় বাস্তবসম্মত নয়। এসব এলাকাকে মূল গণপরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতেই মনোরেল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি মেট্রোরেলের বিকল্প নয়, বরং একটি পরিপূরক (ফিডার) ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।”
তিনি আরও জানান, বিদ্যমান কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (ইউআরএসটিপি)-তে পাঁচটি মনোরেল লাইনের প্রস্তাব থাকলেও চলমান সমীক্ষায় প্রয়োজনে আরও দুই থেকে তিনটি সম্ভাব্য করিডোর যুক্ত করে মূল্যায়ন করা হবে। প্রতিটি রুটে যাত্রীচাপ, জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন, মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ এবং বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করা হবে।
বর্তমান প্রস্তাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য পাঁচটি মনোরেল রুট হলো—
১) বিমানবন্দর থেকে জলসিঁড়ি-পূর্বাচল
২) বিমানবন্দর থেকে সাভার
৩) মোহাম্মদপুর থেকে পোস্তগোলা
৪) মধ্য বাড্ডা থেকে ভুলতা
৫) রামপুরা থেকে ডেমরা
ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, রুটগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে মেট্রোরেলের আওতার বাইরে থাকা জনবহুল এলাকাগুলো দ্রুত মূল ট্রানজিট নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, ডেমরা, পূর্বাচল, ভুলতা ও সাভারের মতো এলাকায় যাতায়াত সহজ হবে। পাশাপাশি বিমানবন্দর ও নতুন আবাসিক এলাকাগুলোর সঙ্গে দ্রুত সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, “আমরা আপাতত দুটি রুটকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোচ্ছি। বুয়েট প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ করছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শকদের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াও চলছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়া যাবে, যার ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়া হবে।”

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মনোরেলের অন্যতম সুবিধা হলো এর সরু কাঠামো, যার কারণে জমি অধিগ্রহণ কম লাগে এবং নির্মাণকাজে নগরের স্বাভাবিক চলাচলে তুলনামূলক কম বিঘ্ন ঘটে। এছাড়া বিদ্যুচ্চালিত রাবার চাকার প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শব্দ ও কম্পনও প্রচলিত রেলব্যবস্থার তুলনায় কম।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মনোরেলের কার্যকারিতা নির্ভর করবে এটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে মেট্রোরেল, বিআরটি ও বিদ্যমান বাস নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিত করা যায় তার ওপর। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিচালিত হলেই মনোরেল সবচেয়ে বেশি সফলতা অর্জন করে।