বয়ঃসন্ধিতে সন্তানের বন্ধু নির্বাচন: ভালো ও ক্ষতিকর বন্ধুত্বের পার্থক্য শেখাবেন কীভাবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তা,ঢাকা:২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বয়ঃসন্ধিকাল প্রতিটি কিশোর-কিশোরীর জীবনে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও রূপান্তরের সময়। এই বয়সে সন্তান ধীরে ধীরে পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের একটি আলাদা জগৎ তৈরি করতে শুরু করে, যেখানে বন্ধুদের প্রভাব থাকে সবচেয়ে বেশি। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) মতে, বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ ও সামাজিক অবস্থান সমবয়সীদের কাছ থেকেই বেশি শেখে।
অনেক সময় অভিভাবকের সঠিক উপদেশও তাদের কাছে ‘বিরক্তিকর’ মনে হতে পারে, অথচ বন্ধুর একটি কথাই তাদের কাছে হয়ে ওঠে চরম সত্য। তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে তা নিয়ে কেবল আতঙ্কিত হলে চলবে না; বরং তাকে সুস্থ ও ক্ষতিকর বন্ধুত্বের পার্থক্যটি নিজে থেকে বুঝতে শেখানোই অভিভাবকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
নিচে সন্তানকে ভালো ও ক্ষতিকর বন্ধুত্বের পার্থক্য বোঝানোর কিছু কার্যকরী ও বিজ্ঞানসম্মত উপায় তুলে ধরা হলো:
সুস্থ ও ইতিবাচক বন্ধুত্বের বৈশিষ্ট্য চেনান
সন্তানকে প্রথমেই বোঝাতে হবে যে, ভালো বন্ধু মানেই এমন কেউ নয় যার সব মতের সঙ্গে একমত হতে হবে। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস (এএপি)-এর মতে, স্বাস্থ্যকর বন্ধুত্বের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা, সদয় আচরণ এবং ভুল হলে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা।
ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক বন্ধুত্বের লক্ষণগুলো ধরিয়ে দিন
কোনো বন্ধুকে সরাসরি ‘খারাপ’ বললে বয়ঃসন্ধিকালের স্বভাবসুলভ জেদের কারণে সন্তান উল্টো সেই বন্ধুর পক্ষ নিতে পারে। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট আইলিন কেনেডি-মুর পরামর্শ দেন, সরাসরি নিষেধ করার বদলে সন্তানকে ওই সম্পর্কটি নিয়ে ভাবতে সাহায্য করুন।
‘না’ বলতে শেখান এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ান
বয়ঃসন্ধিতে সমবয়সীদের চাপ (Peer Pressure) প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়। দলে টিকে থাকার জন্য অনেক কিশোর-কিশোরী নিজেদের মতাদর্শ থেকে সরে আসে। সন্তানকে ছোট ছোট বাক্যে দৃঢ়তার সঙ্গে ‘না’ বলতে শেখান। যেমন— "আমি এটা করতে চাই না", "এটা আমার ভালো লাগছে না"। নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি অবিচল থাকার এই আত্মবিশ্বাস তাকে ভবিষ্যতের অনেক অপরাধ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করবে।
৪. ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে সমান নিয়ম রাখুন
আমাদের সমাজে অনেক সময় ছেলেদের বন্ধুত্বে ‘দুষ্টুমি’ বলে নেতিবাচক আচরণ এড়িয়ে যাওয়া হয়, আবার মেয়েদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শাসন করা হয়। এটি মোটেও উচিত নয়। ছেলে হোক বা মেয়ে—বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সম্মান, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত সীমারেখার অধিকার সবার সমান।
৫. নিষেধ করার আগে মন দিয়ে শুনুন
সন্তান যখন তার কোনো বন্ধুর কথা আপনাকে বলে, তখন সঙ্গে সঙ্গে নেতিবাচক মন্তব্য করবেন না। তাকে কথা শেষ করার সুযোগ দিন। অভিভাবকরা অতিরিক্ত আতঙ্ক দেখালে বা বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে সন্তান ভবিষ্যতে তার সমস্যার কথা শেয়ার করা বন্ধ করে দেবে।
৬. সন্তানের সামাজিক জগৎকে জানুন
সন্তানের বন্ধু কারা, তারা কোথায় সময় কাটায়—সে বিষয়ে ধারণা রাখুন। বন্ধুদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। তাদের অভিভাবকদের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করুন। এতে সন্তান অনুভব করবে যে তার জগতকে আপনি সম্মান করছেন। তবে খেয়াল রাখবেন, নজরদারি যেন অতিরিক্ত বা বিরক্তিকর পর্যায়ে না যায়।
সন্তানকে কেবল "ভালো বন্ধু বেছে নাও" বলাই যথেষ্ট নয়। তাকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যেন বাবা-মায়ের
অনুপস্থিতিতেও সে নিজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যে সম্পর্কে সম্মান ও নিজের মতো থাকার স্বাধীনতা আছে, সেটিই স্বাস্থ্যকর বন্ধুত্ব। আর যেখানে ভয়, অপমান ও নিয়ন্ত্রণ কাজ করে, সেখান থেকে দূরত্ব বজায় রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
(তথ্যসূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস, সাইকোলজি টুডে ও টাইমস অব ইন্ডিয়া)