বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট রোকসানা: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও এক মর্মান্তিক ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক | আদালত বার্তাঃ৫ আগষ্ট ২০২৬
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও গর্বের নাম সৈয়দা কানিজ ফাতেমা রোকসানা—দেশের প্রথম নারী বাণিজ্যিক বিমানচালক। ১৯৫৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা এই অসাধারণ মেধাবী নারী শৈশব থেকেই আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখতেন। ছোটবেলায় আকাশে উড়ে যাওয়া বিমান দেখেই তার মনে জন্ম নেয় এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা—একদিন তিনিও উড়বেন।
রোকসানা শুধু মেধাবীই ছিলেন না, ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি রেডিও ও টেলিভিশনে গান গাইতেন। জার্মান ভাষায় ডিপ্লোমা অর্জন করেন এবং জার্মানিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার জন্য স্কলারশিপও লাভ করেন। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল আকাশজয়ী হওয়া—সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তাকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়।
জার্মানিতে না গিয়ে তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন এবং খুঁজে বের করেন বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাব। ১৯৭৬ সালে তিনি সেখানে যোগ দেন এবং কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে অর্জন করেন বাণিজ্যিক বিমান চালানোর লাইসেন্স—যা তাকে দেশের প্রথম নারী পাইলট হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে দেয়।
মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: ৫ আগস্ট ১৯৮৪
১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট, অভিজ্ঞ পাইলট রোকসানা প্রায় ৫,০০০ ঘণ্টা উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফকার এফ-২৭ (F27-600) বিমান (ফ্লাইট নম্বর S2-ABJ) চালিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু যাত্রাপথে আবহাওয়া দ্রুত খারাপ হয়ে ওঠে—ঝড়, প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণের জন্য তিনি তিনবার চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সফল হননি। শেষ প্রচেষ্টায় বিমানটি রানওয়ের খুব কাছে চলে এলেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রানওয়ে থেকে প্রায় ৫৫০ মিটার দূরে জলাভূমিতে বিধ্বস্ত হয়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় রোকসানাসহ মোট ৪৯ জন নিহত হন।
দায়িত্বের মূর্ত প্রতীক: রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান
এই দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। তৎকালীন নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি নিজে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করতে থাকেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘটনাস্থলেই অবস্থান করেন—যা দেশের প্রেক্ষাপটে বিরল দৃষ্টান্ত।
উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সময় তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করলেও তা গোপন রাখেন। একপর্যায়ে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু পরদিন ৬ আগস্ট ১৯৮৪ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।
উল্লেখ্য, রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা ডা. যোবায়দা রহমান এবং তার জামাতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
স্মরণে এক বেদনাময় অধ্যায়
এই দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন ফ্লাইট স্টুয়ার্ড জাকির হোসেনও। পরবর্তীতে তার একমাত্র কন্যা জাফরিন জাকিয়ার সৌজন্যে তার ছবি প্রকাশিত হয়। দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটি ১৯৭১ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং ১৯৭৪ সালে তেজগাঁও বিমানবন্দরে এর একটি ছবি তোলা হয়েছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দুর্ঘটনা শুধু একটি ট্র্যাজেডিই নয়, বরং সাহস, দায়িত্ববোধ এবং স্বপ্নের এক করুণ সমাপ্তির প্রতীক। রোকসানার জীবন আমাদের শেখায়—স্বপ্ন যত বড়ই হোক, তা অর্জনে সাহস ও দৃঢ়তা প্রয়োজন।
রোকসানা, রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান এবং ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছে ‘আদালত বার্তা’। আমরা তাদের আত্মার মাগফিরাত ও চিরশান্তি কামনা করছি।