বাংলাদেশ কি সত্যিই গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হতে পেরেছে?
রাজনৈতিক বিভাজন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির অন্তরালে সংকট—উত্তরণের পথ কোনটি?
সম্পাদকীয়, আদালত বার্তাঃ২৫ আগস্ট ২০২৬।
বর্তমানে রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গভীর নীতিগত প্রশ্ন যা সংক্ষেপে বললে—বাংলাদেশ এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত উদার, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পরিবেশ পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। তবে ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর নতুন একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে—সেটি কাজে লাগানো যাবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১. সংবিধানের বাংলাদেশ বনাম বাস্তব বাংলাদেশের ব্যবধান
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের লক্ষ্য হিসেবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা স্পষ্টভাবে বলেছে। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তার কথা রয়েছে; ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১২ অনুচ্ছেদে অসাম্প্রদায়িকতার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এবং ধর্মীয় বৈষম্য দূর করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দর্শন মূলত আপনার কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সমস্যা হচ্ছে—কাগজে রাষ্ট্রীয় আদর্শ থাকা আর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে তা কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়।
২. অন্তরালের প্রধান প্রতিবন্ধকতা কোথায়?
আমার বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সংকটের মূল কারণ কোনো একটি দল, ব্যক্তি বা ধর্ম নয়। বরং কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা একে অপরকে শক্তিশালী করে।
ক. রাজনীতিকে ‘রাষ্ট্র পরিচালনা’ নয়, ‘ক্ষমতা দখল’ হিসেবে দেখা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় নীতির প্রতিযোগিতা না হয়ে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।
ফলে:
সরকারে থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজের শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার → বিরোধী অবস্থানে গেলে সেই প্রতিষ্ঠানকে অবিশ্বাস → ক্ষমতা পরিবর্তনের পর প্রতিশোধ → আবার নতুন ক্ষমতাসীনদের একই আচরণ।
এই চক্র ভাঙতে না পারলে সরকার পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন হবে না।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও অতিরাষ্ট্রীয় সহিংসতা সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে বলে Freedom House-এর ২০২৬ মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
খ. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করতে না পারা
গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা সংসদ নির্বাচন নয়; বরং—
বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন?
নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষ?
পুলিশ কাকে দেখে আইন প্রয়োগ করে?
প্রশাসন দল নয়, রাষ্ট্রের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ?
দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন?
গণমাধ্যম কতটা মুক্ত?
বিরোধী মত কতটা নিরাপদ?
এগুলোই আসল প্রশ্ন।
একটি সরকার যদি নির্বাচন জিতে মনে করে “রাষ্ট্র এখন আমাদের”, তাহলে গণতন্ত্রের জায়গায় সংখ্যাগরিষ্ঠতান্ত্রিক ক্ষমতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।
গণতন্ত্রের প্রকৃত দর্শন হলো:
নির্বাচনে জয়ী দল সরকার পরিচালনা করবে; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দলের সম্পত্তি হবে না।
৩. দ্বিতীয় বড় সমস্যা—‘বিজয়ী সবকিছু পাবে’ সংস্কৃতি
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরাজয়কে অনেক সময় স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না।
একটি দল ক্ষমতায় গেলে অন্য পক্ষ মনে করে—
“আমরা শেষ।”
আর ক্ষমতাসীন পক্ষ ভাবে—
“আমরা এখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।”
এটি গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর।
কারণ প্রকৃত গণতন্ত্রের সূত্র হলো:
আজ তুমি সরকার → আগামীকাল আমি সরকার → কিন্তু রাষ্ট্র আমাদের সবার।
এই বোধ তৈরি না হলে নির্বাচন যতই হোক, রাজনৈতিক সহনশীলতা তৈরি হবে না।
৪. তৃতীয় সমস্যা—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘শত্রু’ বানানো
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভাষায় একটি ভয়ংকর পরিবর্তন ঘটেছে।
প্রতিপক্ষকে বলা হয়—
দেশবিরোধী
ষড়যন্ত্রকারী
স্বাধীনতাবিরোধী
স্বৈরাচারী
ফ্যাসিস্ট
জঙ্গি
ধর্মবিরোধী
রাষ্ট্রদ্রোহী
অর্থাৎ রাজনৈতিক মতবিরোধ ধীরে ধীরে নৈতিক ও অস্তিত্বগত শত্রুতায় পরিণত হয়।
এখানেই সহমতের রাজনীতি ধ্বংস হয়।
একজন গণতান্ত্রিক নাগরিক বলতে পারেন:
“আমি আপনার রাজনৈতিক মতের বিরোধিতা করি, কিন্তু আপনার নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্যও আমি দাঁড়াব।”
বাংলাদেশে এই সংস্কৃতিটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
৫. ধর্ম বনাম অসাম্প্রদায়িকতা—এখানেও ভুল বোঝাবুঝি আছে
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অসাম্প্রদায়িকতা মানে ধর্মহীনতা নয়।
সংবিধানের ২(ক) অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বলা হলেও একই সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মের সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
সুতরাং বাংলাদেশের উপযোগী অসাম্প্রদায়িকতার অর্থ হওয়া উচিত:
“রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে তার ধর্মের কারণে কম বা বেশি নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করবে না।”
একইভাবে ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা থাকবে, আবার ধর্মকে ব্যবহার করে অন্য নাগরিকের অধিকার হরণও করা যাবে না।
৬. চতুর্থ সমস্যা—অর্থনৈতিক বৈষম্য
গণতন্ত্র শুধু ভোটের অধিকার নয়।
যে তরুণের চাকরি নেই,
যে কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না,
যে শ্রমিক জীবন চালাতে পারেন না,
যে মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে পিছিয়ে পড়েন,
যে নাগরিক চিকিৎসা বা শিক্ষা কিনতে পারেন না—
তার কাছে রাজনৈতিক স্বাধীনতার মূল্য অনেক সময় সীমিত হয়ে যায়।
সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সুযোগের সমতা নিশ্চিত এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে।
তাই সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ = গণতন্ত্র + আইনের শাসন + অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার।
৭. পঞ্চম সমস্যা—প্রতিশোধের রাজনীতি
এটি সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক চক্র।
এক সরকার ক্ষমতায় এসে আগের সরকারের লোকজনকে মামলা দেয়।
পরের সরকার এসে আগের সরকারের লোকদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়।
তারপর তৃতীয় পক্ষ ক্ষমতায় এসে দুপক্ষকেই মামলা দেয়।
এভাবে আইন বিচার পাওয়ার মাধ্যম না হয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধের অস্ত্র হয়ে উঠলে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচারিক প্রক্রিয়া, আটক ও রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।
এখানে মূল নীতি হওয়া উচিত:
অপরাধ করলে বিচার হবে—কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়; ব্যক্তিগত অপরাধের প্রমাণের ভিত্তিতে।
৮. ষষ্ঠ সমস্যা—গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের নিরাপত্তা
গণতন্ত্রে সরকারকে সমালোচনা করার অধিকার সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র নয়।
বরং সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকারই গণতন্ত্রের অক্সিজেন।
সাংবাদিক ভুল করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকের প্রশ্ন, সম্পাদকীয় অবস্থান বা রাজনৈতিক মতকে অপরাধ বানানোর প্রবণতা থাকলে গণমাধ্যম স্বাধীন থাকে না।
সাম্প্রতিক একটি মামলায় তিন সাংবাদিককে ২০২৪ সালের আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় বিচার পর্যন্ত আটক রাখার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে।
৯. তাহলে উত্তরণের পথ কী?
এটিকে “৭ দফা গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন” হিসেবে দেখব।
১. রাষ্ট্রকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা
পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান ও বিচারব্যবস্থায় নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২. বিচার বিভাগের পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা
বিচারকের স্বাধীনতা শুধু নিয়োগের স্বাধীনতা নয়।
প্রয়োজন:
স্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামো
স্বচ্ছ নিয়োগ
জবাবদিহিমূলক বিচারব্যবস্থা
মামলা ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ
রাজনৈতিক মামলার অপব্যবহার বন্ধ
জামিন ও তদন্তে আইনের সমান প্রয়োগ
৩. বিরোধী দলকে রাষ্ট্রের শত্রু না ভাবা
সংসদে বিরোধী দল থাকবে—এটাই গণতন্ত্র।
বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়।
সরকারকে বিরোধী দলকে কথা বলার জায়গা দিতে হবে; বিরোধী দলকেও সরকারকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে সমালোচনা করতে হবে।
৪. রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র
একটি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই যদি অগণতান্ত্রিক হয়, তাহলে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কঠিন।
প্রয়োজন:
দলীয় নেতৃত্বে নিয়মিত নির্বাচন
প্রার্থী মনোনয়নে স্বচ্ছতা
অর্থের উৎস প্রকাশ
রাজনৈতিক কর্মীদের জবাবদিহি
সহিংস রাজনীতির বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা
৫. ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য শূন্য-সহনশীলতা
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা অন্য কোনো পরিচয় নয়—প্রথম পরিচয় নাগরিক।
কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হলে অপরাধীর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয় না দেখে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৬. অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার
উন্নয়ন শুধু GDP দিয়ে মাপলে চলবে না।
মাপতে হবে:
চাকরি + আয় + শিক্ষা + স্বাস্থ্য + বাসস্থান + সামাজিক নিরাপত্তা + নিরাপদ পরিবেশ।
৭. ‘প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার’ নীতি
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অতীতের অপরাধের বিচার হবে, কিন্তু অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিচার হবে না।
এই দুটি বিষয় আলাদা করতে না পারলে বাংলাদেশ আবারও প্রতিশোধের চক্রে ঢুকে পড়বে।
১০. ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সামনে বিশেষ সুযোগ
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় ফিরেছে এবং আগস্টে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি ও তার মিত্ররা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালীও করতে পারে, আবার ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণও ঘটাতে পারে।
কারণ বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সংস্কার করা সহজ—কিন্তু একই সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে যদি বিরোধী মতকে দুর্বল করা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাই বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সুযোগ হলো:
“আমরা ক্ষমতায় এসেছি রাষ্ট্র দখল করতে নয়; রাষ্ট্রকে দলীয় দখলমুক্ত করতে।”
১১. এই বিষয় গভীরতম সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশের সমস্যা মূলত মানুষের সমস্যা নয়; প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমস্যা।
বাংলাদেশের মানুষ অসহিষ্ণু—এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়।
একই গ্রামের মানুষ একসঙ্গে ঈদ করে, পূজা দেখে, বিপদে একে অপরকে সাহায্য করে, একই বাজারে ব্যবসা করে, একই স্কুলে সন্তান পড়ায়।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় সামনে এলে সেই মানুষই বিভক্ত হয়ে যায়।
অর্থাৎ বিভাজনের বড় অংশটি সামাজিকভাবে স্বতঃস্ফূর্ত নয়; রাজনৈতিকভাবে উৎপাদিত।
তাই সমাধানও রাজনৈতিক।
শেষ কথা: বাংলাদেশ কেমন হতে পারে?
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্র—
যেখানে সরকার বদলালে রাষ্ট্র বদলাবে না।
যেখানে বিরোধী দল সরকারকে প্রশ্ন করলে রাষ্ট্রদ্রোহী হবে না।
যেখানে একজন মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক আইনের সামনে সমান।
যেখানে বিচার হবে অপরাধের, রাজনৈতিক পরিচয়ের নয়।
যেখানে সাংবাদিক প্রশ্ন করলে তাকে শত্রু ভাবা হবে না।
যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সংখ্যালঘুর অধিকারও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
যেখানে নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তন করবে না—রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিও পরিবর্তন করবে।
সবচেয়ে বড় কথা—
গণতন্ত্রের অর্থ শুধু “আমার দল জিতবে” নয়; গণতন্ত্রের অর্থ হলো “আমার দল হারলেও আমার অধিকার থাকবে।”
এই জায়গায় বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু সাংবিধানিক কাঠামো, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সামাজিক চুক্তি তৈরির সুযোগ এখনো আছে। সংবিধান নিজেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সমতা ও অসাম্প্রদায়িকতার যে নীতিগত ভিত্তি দিয়েছে, সেটিকে বাস্তব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই হবে মূল কাজ।
