বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের বিদায়ী ভাষণে বলেন --
“বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে নয়।”
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তাঃ
বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম
১৪ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বিচারকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করলেও ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে কখনো সরে যাবেন না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমি আজ বিচারকের আসন থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অটুট থাকবে।”
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে নিজের শেষ কর্মদিবসে বিদায়ী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, একজন বিচারকের আনুগত্য কখনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি হতে পারে না; বরং তা হতে হবে সংবিধান, আইন এবং নিজের বিবেকের প্রতি। এই মূল্যবোধই বিচার বিভাগের মূল ভিত্তি এবং জনগণের আস্থা অর্জনের প্রধান শর্ত।
তার সম্মানে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনায় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি অংশ নেয়। এতে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বক্তব্য রাখেন। প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিরাও উপস্থিত ছিলেন।
দুই দশকেরও বেশি সময় সুপ্রিম কোর্টে দায়িত্ব পালন এবং চার দশকের আইনজীবী ও বিচারিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, “এটি আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও আমি এটিকে নতুন এক সূচনার অংশ হিসেবেই দেখি।”
তিনি বিচার বিভাগের সার্বিক উন্নয়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বিচার বিভাগ কেবল বিচারক বা আইনজীবীদের নয়; এটি সংশ্লিষ্ট সকলের একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান। সবাই যদি এটিকে নিজের প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করেন, তবে এর মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
নবীন আইনজ্ঞদের উদ্দেশে তিনি সততা, চরিত্র ও অধ্যয়নের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সততা। এরপর তার চরিত্র এবং অধ্যয়ন। আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই শেখার কোনো বিকল্প নেই।” তিনি নিয়মিত সংবিধান, আইন ও দেশি-বিদেশি রায় অধ্যয়নের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মামলার জট কমানো, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা এখন সময়ের দাবি। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিচক্ষণ ব্যবহার বিচার ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও সেবামুখী করে তুলতে পারে।
জেলা পর্যায়ের বিচারকদের উদ্দেশে তিনি নির্ভীকভাবে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ধৈর্য ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে জনগণের আস্থা অটুট থাকবে।
বিদায়ী বক্তব্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের উদ্ধৃতি টেনে বলেন, “বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগে নয়; তার শক্তি নিহিত বিচারবোধ, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থায়।” তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়, এটি স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার অঙ্গীকার—যা সমুন্নত রাখা বিচার বিভাগের দায়িত্ব।
শেষে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, “বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে নয়।” তিনি ভবিষ্যতেও দেশের বিচার বিভাগের উন্নয়নে নিজের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য দিয়ে অবদান রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।