প্রিন্ট এর তারিখঃ নভেম্বর ৫, ২০২৬ || প্রকাশের তারিখঃ নভেম্বর ৫, ২০২৬
বিচার বিভাগের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম: একটি মহাকাব্যের অবসান নাকি নতুন সংকটের শুরু?
বিচার বিভাগের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম: একটি মহাকাব্যের অবসান নাকি নতুন সংকটের শুরু?
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন,আদালত বার্তা ডেস্কঃ৪ নভেম্বর ২০২৬
সমন জারিতে ঘুস দাবি ও বরখাস্তের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল বিচার প্রশাসনের ভেতরকার চিত্র; কাঠামোগত সংস্কারের দাবি বিচারপ্রার্থীদের
সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল আদালত প্রাঙ্গণে পা রাখলেই পদে পদে ফাইল আটকে থাকার অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নেজারত বিভাগের জারিকারক এস এম শফিউর রহমানের প্রকাশ্যে ঘুস দাবি এবং ফলশ্রুতিতে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনাটি বিচার বিভাগের তৃণমূল স্তরের প্রশাসনিক চিত্রকে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
দেওয়ানি মামলার সমন জারির মতো প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্যে অর্থ দাবি এবং তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে দাপ্তরিক কাজ করানোর অভিযোগ পুরো ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত জারিকারক এস এম শফিউর রহমান এর আগেও চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। প্রশাসনিক ও আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগে তিনি পুনর্বহাল হন এবং পুনরায় একই ধরনের অনিয়মে জড়ান।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সাময়িক বরখাস্ত বা বদলি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। শাস্তির দৃষ্টান্তমূলক নজির না থাকায় অসাধু চক্র আদালত প্রাঙ্গণকে ব্যক্তিগত বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত করার সাহস পায়। নিম্ন আদালতের নেজারত শাখা, পেশকার এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় এমন ঘটনা ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—দেশের অধিকাংশ অধস্তন আদালতের বারান্দায় প্রতিদিন ভিড় জমান হাজারো বিচারপ্রার্থী। ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়:
- ধাপে ধাপে অর্থ দাবি: ফাইলের গতি বাড়ানো, নতুন তারিখ নেওয়া কিংবা সমন জারির মতো নিয়মিত প্রক্রিয়ায় অবৈধ অর্থ লেনদেন প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
- ফাইল জট ও কৃত্রিম বিলম্ব: দাবিকৃত অর্থ না দিলে নথি আটকে রাখা কিংবা সমন পৌঁছাতে অযথা কালক্ষেপণের অভিযোগ নিয়মিত।
- প্রান্তিক মানুষের নিঃস্ব হওয়া: জমিজমা বা ফৌজদারি বিরোধে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে সাধারণ মানুষ দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত খরচের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন।
সংকটের মূল উৎস
আদালত বিশ্লেষক ও আইনজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই অচলাবস্থার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী:
- অভ্যন্তরীণ নজরদারির ঘাটতি: অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের ওপর সার্বক্ষণিক প্রশাসনিক তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অত্যন্ত সীমিত।
- পুনর্বাসনের সংস্কৃতি: বিভাগীয় মামলায় চূড়ান্ত শাস্তির বদলে আপিল বা প্রভাব খাটিয়ে চাকরিতে ফিরে আসার সুযোগ দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে।
- ম্যানুয়াল ব্যবস্থার দুর্বলতা: কাগজের নথি ও সরাসরি ব্যক্তি-যোগাযোগের কারণে অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ উন্মুক্ত থাকে।
উত্তরণের পথরেখা: পাঁচ দফা সংস্কার প্রস্তাব
বিচার ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা আমূল সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন:
- দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ও আইনি শাস্তি: দুর্নীতির প্রমাণ মিললে কেবল সাময়িক বরখাস্ত নয়, বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে চাকরিচ্যুতি এবং দুর্নীতি দমন আইনের আওতায় সরাসরি মামলা দায়ের নিশ্চিত করতে হবে।
- প্রক্রিয়াগত পূর্ণ অটোমেশন: মামলা দায়ের, ফি প্রদান, নথি ট্র্যাকিং এবং সমন জারির কার্যক্রম শতভাগ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করতে হবে, যাতে বিচারপ্রার্থী ও কর্মচারীদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের সুযোগ বন্ধ হয়।
- স্বাধীন ভিজিল্যান্স সেল: প্রতিটি আদালত চত্বরে ছদ্মবেশী গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্বাধীন ভিজিল্যান্স টিম সক্রিয় রাখতে হবে।
- বিচারকদের প্রশাসনিক তদারকি জোরদার: বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্ব-স্ব এজলাস ও দপ্তরের কর্মচারীদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের প্রশাসনিক ক্ষমতা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
- সহজ অভিযোগ মাধ্যম ও হটলাইন: বিচারপ্রার্থীরা যেন কোনো ধরনের ভয় ছাড়া সরাসরি জেলা জজ বা উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে অনিয়মের অভিযোগ জানাতে পারেন, সেজন্য প্রতিটি আদালতে কার্যকর অভিযোগ বক্স ও সার্বক্ষণিক হটলাইন চালু রাখা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে বিচার বিভাগের সততা ও নিরপেক্ষতা রক্ষা করা অপরিহার্য। গুটি কয়েক অসাধু কর্মচারীর দুর্নীতির দায় পুরো বিচার বিভাগ বহন করতে পারে না। এখনই সময় কঠোর শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে বিচারালয়কে দুর্নীতিমুক্ত করে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার।
Copyright © 2026 আদালত বার্তা. All rights reserved.