বিচার বিভাগ এখন জনগণকে ‘নির্যাতনের’ জায়গা: মাসদার হোসেন
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ১১ এপ্রিল ২০২৬
“কেন আমাদের বিচার বিভাগকে নিয়ে এত ভয়? কেন আমরা একে ‘টুলস’ বানাতে চাই?”
বিচার বিভাগ এখন বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার দেওয়ার বদলে ‘নির্যাতন’ করছে বলে মনে করেন সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন, যিনি প্রায় তিন দশক আগে স্বাধীন বিচার বিভাগ চেয়ে মামলা করেছিলেন।
এই মুহূর্তে দেশে প্রায় ৪৭ লাখ মামলার জট রয়েছে বলেও তুলে ধরেন তিনি।
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’ এবং ‘আইন ও বিচার’ পত্রিকা আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় এই মন্তব্য করেন মাসদার হোসেন মামলায় খ্যাত অবসরপ্রাপ্ত এই বিচারক।
সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অধ্যাদেশ ও বিচার বিভাগের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এই সভায় মাসদার হোসেন দেশের বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন।
বিচার ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে মাসদার হোসেন বলেন, “আমাদের দেশের বিচার বিভাগ বিচারপ্রার্থীদের প্রতি ন্যায়বিচার ‘ডিসচার্জ’ করছে না, নির্যাতন করছে। এই মুহূর্তে দেশে প্রায় ৪৭ লক্ষ মামলার জট রয়েছে।
“অথচ আমাদের প্রতিবেশি দেশ নেপালে কোনো জট নেই; সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ‘চিফ জাস্টিস’ পর্যন্ত একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে মাত্র দুই বছর সময় লাগে।”
দেশে হত্যা মামলা বিচার শেষ হতে ২৫ থেকে ৪৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগে তুলে ধরে তিনি বলেন, সাগর-রুনী হত্যা মামলার উদাহরণ দিলেই বোঝা যায়—১৪ বছর পার হয়ে গেছে এবং ১২৫ বার সময় নেওয়া হয়েছে।
"এটাই আমাদের বাস্তবতা। অথচ আধুনিক বিশ্বে, যেমন ইংল্যান্ডে একটি সিভিল মামলা নিষ্পত্তি হতে মাত্র ২৮ দিন থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাস লাগে।”
বিচার বিভাগের সার্বভৌমত্বের প্রসঙ্গ টেনে অবসরপ্রাপ্ত এই বিচারক বলেন, “‘রুল অব ল’ অনুযায়ী ‘জুডিশিয়ারিই’ হল সর্বোচ্চ ক্ষমতা। সংসদ আইন পাস করবে, নির্বাহী বিভাগ তা কার্যকর করবে; কিন্তু এই দুই বিভাগের কারণে জনগণের অধিকার খর্ব হলে তা দেখভাল করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। আইন জনবান্ধব না হলে হাই কোর্ট সেটাকে ‘আল্ট্রা ভায়ারস টু দ্য কনস্টিটিউশন’ (সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক) করে দিবে—এটি আদালতের আবশ্যিক দায়িত্ব।
“কেন আমাদের বিচার বিভাগকে নিয়ে এত ভয়? কেন আমরা একে ‘টুলস’ বানাতে চাই? ‘কেয়ারটেকার’ সরকারের প্রধানের প্রলোভন দেখিয়ে কেন এর চরিত্র হরণ করতে চান? ৫৪ বছর ধরে এই বিভাগের সাথে সৎ মা সুলভ আচরণ করা হচ্ছে। বিচারকের বসার জায়গা নেই, টয়লেটে যাওয়ার জায়গা নেই, অথচ পাশে ইউএনও অফিসের অট্টালিকা।”
আইনমন্ত্রীর সাম্প্রতিক অবস্থানের সমালোচনা করে মাসদার হোসেন বলেন, “আইনমন্ত্রী দুই দিন আগে এক রূপে ছিলেন, এখন সংসদে গিয়ে রূপ বদলে ফেলেছেন। তিনি জজদের শোকজ করছেন, ‘আন্ডার হোয়াট অথরিটি’? সংবিধানের ১১৬ ও ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জজদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের, আইনমন্ত্রীর কোনো ক্ষমতা নেই এখানে। এটি বিচার বিভাগের ওপর বেআইনি হস্তক্ষেপ।”
ভবিষ্যৎ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমরা বিচার সংস্কার কমিশন থেকে দক্ষ ও যোগ্যদের নিয়োগের আইন করার সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু এখন আইন বাতিল করা হচ্ছে। আমার আশঙ্কা, অচিরেই আবার সেই অযোগ্য ও রাজনৈতিক অনুসারীদের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে, যা অতীতেও আমরা দেখেছি।”
বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি কয়েক যুগ ধরে বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছিল। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও সভা-সমাবেশের মধ্যে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার আর্জি জানিয়ে মামলা করেন।
সেই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেয়।
সেই রায়ের ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ গত ২০ নভেম্বর সরকারের অনুমোদন পায়।
এ অধ্যাদেশ জারির পর সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয়ের যাত্রা শুরু হয়। তবে বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচার নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করে সংসদে বিল পাস হয়েছে।
বর্তমান সরকারের উদ্দেশে মাসদার হোসেন বলেন, “আপনারা জুলাই আন্দোলনকারীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারা এমনি এমনি উড়ে আসেননি। গত ১৫ বছরে কোনো রাজনৈতিক দল যা করতে পারেনি, এ দেশের ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে তা করে দেখিয়েছে। তাদের রক্তের সাথে বেইমানি করবেন না।”
জনগণ আন্দোলনমুখী, রক্ত দেওয়ার অভ্যাস তাদের আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আপনারা যদি সঠিক পথ হারিয়ে ফেলেন, তবে ইনশাআল্লাহ জনগণই আপনাদের আবার সঠিক পথে তুলে নিয়ে আসবে।”
সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল মতিন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক, আইনজীবী ওমর ফারুক, জুলাই আন্দোলনের নেতা আরিফ সোহেল।