ময়মনসিংহে কাস্টমস কর্মীকে ১৫ টুকরো করে নৃশংস হত্যা: লোভের বলি বিশ্বাস, গ্রেপ্তার কেয়ারটেকার
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তা:৩১ আগষ্ট ২০২৬৮
বিশ্বাসঘাতকতা ও লোভের বশবর্তী হয়ে কত ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে পারে, তার এক চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো ময়মনসিংহে। মায়ের সেবা ও বাড়িঘর দেখাশোনার জন্য রাখা কেয়ারটেকারের হাতেই নির্মমভাবে খুন হলেন কাস্টমস কর্মী আবু রায়হান। হত্যার পর আলামত নষ্ট করতে লাশ ১৫ টুকরো করে গুম করার চেষ্টা করে খুনিরা। তবে প্রযুক্তির সহায়তায় শেষ পর্যন্ত পুলিশের জালে ধরা পড়েছে মূল হোতা কেয়ারটেকার রাজু ও তার সহযোগী সোহেল।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পূর্বপরিকল্পনা
নিহত আবু রায়হান ঢাকায় কাস্টমসে কর্মরত ছিলেন। গ্রামে থাকা মায়ের দেখাশোনা ও বাড়ির সুরক্ষার জন্য দরিদ্র রাজুকে কেয়ারটেকার হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। পরিবারের সদস্যের মতোই রাজুকে স্নেহ ও বিশ্বাস করত রায়হানের পরিবার। প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে গ্রামে মায়ের কাছে আসতেন রায়হান।
দীর্ঘদিন বাড়িতে কাজ করার সুবাদে রাজু পরিবারের টাকা ও স্বর্ণালংকারের খোঁজ পেয়ে যায়। এসব হাতিয়ে নেওয়ার ছক কষতে থাকে সে। কিন্তু আলমারি বা লকারের চাবি রায়হানের কাছে থাকায় সে সরাসরি তা চুরি করতে পারছিল না। অবশেষে রায়হানকে সরিয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর পরিকল্পনা করে এই বেঈমান কেয়ারটেকার।
হত্যার লোমহর্ষক বিবরণ
চলতি মাসের শুরুতে রায়হান ঢাকা থেকে গ্রামে আসেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, কেয়ারটেকার রাজু রাতের বেলায় রায়হানের দুধের সাথে ২০টি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয়। দুধ পান করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রায়হান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এই সুযোগে রাজু লোহার রড দিয়ে রায়হানের মাথায় সজোরে আঘাত করে তাকে হত্যা করে।
লাশ গুমের চেষ্টা ও আলামত নষ্ট
মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর রাজু তার বন্ধু সোহেলকে ডেকে আনে। তারা সাথে করে চাপাতি, গাছের বড় টুকরো এবং পলিথিন নিয়ে আসে। এরপর বাসার ভেতরে বসেই রায়হানের নিথর দেহটিকে ১৫টি টুকরো করে তারা। টুকরোগুলো পলিথিন ও ট্রাভেল ব্যাগে ভরে কিছু দূরের একটি নির্জন ঝোপের মধ্যে ফেলে দিয়ে আসে।
হত্যার কোনো প্রমাণ যেন না থাকে, সেজন্য খুনিরা ডিটারজেন্ট ও হারপিক দিয়ে রুমের মেঝের রক্ত পরিষ্কার করে। এরপর তারা ঘরে থাকা নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে। পরের দিন সকালে তারা স্বাভাবিকভাবে প্রচার করে যে, আবু রায়হান নিখোঁজ হয়েছেন।
প্রযুক্তির ফাঁদে খুনি
হত্যাকাণ্ড ও চুরির পর রাজু নিহতের বিকাশ ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা উত্তোলন করে। আর এই ডিজিটাল লেনদেনের সূত্র ধরেই পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং খুব দ্রুতই রাজুর অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পুলিশের হাতে আটকের পর রাজু ও তার সহযোগী এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে।
আদালতে স্বীকারোক্তি, তদন্ত এখনও চলমান
গ্রেপ্তারের পর দুই আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মামলার তদন্তে নতুন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করেছে। তবে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি এবং পুলিশের তদন্তে পাওয়া তথ্যের পাশাপাশি মামলার অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণও বিচারিক প্রক্রিয়ায় মূল্যায়িত হবে।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় কাস্টমস কর্মী আবু রায়হান তালুকদার হত্যাকাণ্ডের রহস্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার বাড়ির কেয়ারটেকার রাজু মির্জা ও তাঁর সহযোগী সোহেল মির্জা ওরফে জিতুল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা ও সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।
গত ২৬ আগস্ট রাতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে রাজু মির্জা ও সোহেল মির্জাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ২৭ আগস্ট তাঁদের ময়মনসিংহের আদালতে হাজির করা হলে জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইকবাল হোসেন তাঁদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
বিশ্বাসের সম্পর্ক যখন হত্যার কারণ
ময়মনসিংহের এই ঘটনা শুধু একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড নয়; এটি পারিবারিক নিরাপত্তা, বিশ্বাস এবং গৃহপরিচর্যাকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে অসতর্কতার ভয়াবহ পরিণতিরও উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
একজন কেয়ারটেকার দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে থাকার সুবাদে ঘরের অভ্যন্তরীণ তথ্য, আর্থিক অবস্থা ও সম্পদের বিষয়ে ধারণা পেতে পারেন। তাই গৃহকর্মী, কেয়ারটেকার কিংবা ব্যক্তিগত সহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচয় ও পূর্বপরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং আর্থিক ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তদন্তাধীন মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে নয়, আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে—এটাই আইনের মৌলিক নীতি।
আলামত ও পুলিশের পদক্ষেপ
মহান পুলিশের হাতে আটক হওয়া এই দুই নরপিশাচকে দেখা যাচ্ছে। ছবিতে সুস্পষ্টভাবে উদ্ধারকৃত আলামতসমূহ প্রদর্শন করা হয়েছে, যার মধ্যে লাশ কাটার জন্য ব্যবহৃত গাছের সেই গুঁড়ি (টুকরো) এবং অন্যান্য ধারালো অস্ত্র রয়েছে। আসামিদের বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে হত্যা ও লাশ গুমের (দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারা) সুনির্দিষ্ট মামলা দায়েরের হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। গৃহকর্মী বা কেয়ারটেকার নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অতীত ইতিহাস যাচাই (Police Verification) করা এবং অতিরিক্ত বিশ্বাস বা আবেগের বশবর্তী হয়ে মূল্যবান সম্পদের তথ্য তাদের সামনে প্রকাশ না করার বিষয়ে সকল
কে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।