মানবপাচার দমনে অগ্রগতির স্বীকৃতি, তবু টিয়ার-২ তালিকায় বাংলাদেশ
আইন কঠোর করার উদ্যোগ থাকলেও দণ্ড, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও পুনর্বাসনে ঘাটতি কাটেনি
নিউজ ডেস্ক | আদালত বার্তা
মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে অগ্রগতি হয়েছে। তবে অপরাধীদের দণ্ড নিশ্চিত করা, দেশের অভ্যন্তরে মানবপাচার প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনে ঘাটতি রয়ে গেছে। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মানবপাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে আগের মতোই ‘টিয়ার-২’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত Trafficking in Persons (TIP) Report 2026 অনুযায়ী, মানবপাচার নির্মূলে নির্ধারিত ন্যূনতম মানদণ্ড বাংলাদেশ পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। তবে আগের প্রতিবেদন সময়ের তুলনায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাকে অগ্রগতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবপাচার দমনে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ সরকার ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড সাপ্রেশন অব হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড স্মাগলিং অব মাইগ্রেন্টস অর্ডিন্যান্স-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। পাশাপাশি মানবপাচারের ঘটনায় তদন্ত ও মামলা বৃদ্ধি, অপরাধ শনাক্তকরণ এবং ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করার নির্দেশিকা হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দ্রুত সুরক্ষা সেবার আওতায় আনা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ডিজিটাল ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম) পরীক্ষামূলকভাবে চালুর উদ্যোগকেও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা জোরদারের মাধ্যমে মানবপাচারের ঝুঁকি কমানোর প্রচেষ্টাও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
দণ্ড কমা ও অভ্যন্তরীণ পাচার বড় উদ্বেগ
আইনি উদ্যোগের স্বীকৃতি থাকলেও মানবপাচারবিরোধী কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, দোষী মানবপাচারকারীদের দণ্ডের সংখ্যা কমেছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত মানবপাচার মোকাবিলায় পর্যাপ্ত পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।
মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করার সংখ্যাও কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে এসব সীমাবদ্ধতা উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অভিবাসন ব্যয় ও ঋণের ফাঁদে বাড়ছে ঝুঁকি
বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিয়োগ ফি নেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থাকেও মানবপাচারের ঝুঁকি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ফি পরিশোধ করতে গিয়ে অনেক কর্মী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ফলে তাঁরা প্রতারণা, শোষণ এবং জবরদস্তিমূলক শ্রমের মতো পরিস্থিতিতে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নিয়োগ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার গুরুত্ব এখানেই।
জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমাস টমি পিগট বলেন, মানবপাচার স্বাধীনতা ও মর্যাদার মৌলিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত। ২০২৬ সালের টিআইপি প্রতিবেদনে আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে অপরাধী সংগঠন ও দমনমূলক সরকারগুলোর মানবপাচারকে কাজে লাগানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মানবপাচারকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মানবপাচারকারী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং বিচারের মুখোমুখি করতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করবে।
শুধু আইন প্রণয়ন নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ
মানবপাচার একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রতারণা, অর্থনৈতিক শোষণ, জবরদস্তিমূলক শ্রম ও মানুষের স্বাধীনতা হরণের মতো অপরাধ। এ অপরাধ প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেবল আইনি কাঠামো তৈরি করেই প্রত্যাশিত ফল অর্জন সম্ভব নয়।
প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার, দণ্ড নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের নিরাপদ
আশ্রয় ও পুনর্বাসন এবং বিদেশগামী কর্মীদের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে পাচারের শিকার নারী, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করে সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য টিয়ার-২ শ্রেণিতে অবস্থান অব্যাহত থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। অগ্রগতির উদ্যোগগুলোকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করতে হলে অপরাধীদের দায়মুক্তি কমানো, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সেবা বাড়ানো এবং পাচার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় জোরদার করা জরুরি।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের Trafficking in Persons Report 2026।