যানজট নিয়ন্ত্রণে ড্রোন সার্ভিলেন্স, এআই ক্যামেরার পর ঢাকার ট্রাফিকে নতুন প্রযুক্তি
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬
রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরার পর এবার ড্রোন সার্ভিলেন্স চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে একটি ড্রোন দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও যানজটপ্রবণ এলাকায় রিয়েল টাইম তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ড্রোনে অটোমেটেড নম্বর প্লেট রিকগনিশন (এএনপিআর) প্রযুক্তি যুক্ত করে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহন শনাক্ত এবং ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে মামলা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
যানজটের কারণ শনাক্ত হবে তাৎক্ষণিক
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ঢাকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশাপাশি ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতেও হঠাৎ যানজট সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে যানজটের প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ড্রোন ব্যবহার করা হলে আকাশপথ থেকে পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যাবে। ফলে কোথায় যানবাহন আটকে আছে, কোন যান বা কোন পরিস্থিতির কারণে যানজট তৈরি হয়েছে এবং কোন পথে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয়ে ট্রাফিক কর্মকর্তারা রিয়েল টাইম তথ্য পেতে পারবেন।
আইন ভাঙলেই আকাশ থেকে সতর্কবার্তা
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ড্রোনে ভয়েস বা শব্দ সম্প্রচারের সুবিধাও থাকবে। কোনো যানবাহন সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে ড্রোন থেকেই চালককে সতর্ক করা সম্ভব হবে।
ডিএমপি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো গাড়ি যানজট সৃষ্টি করলে ড্রোন থেকে সরাসরি চালককে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ শুধু রাস্তার মোড়ে দায়িত্বরত সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না; আকাশপথ থেকেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে।
এএনপিআর যুক্ত হলে ভিডিও মামলার সুযোগ
ড্রোনে এএনপিআর প্রযুক্তি যুক্ত করা হলে ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের নম্বর প্লেট শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। এর সঙ্গে ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা যুক্ত হলে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে মামলা করা সম্ভব হবে।
তবে ডিএমপি এখনই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা করার পর্যায়ে যায়নি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুল শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বর্তমানে কোনো ঘটনার ফুটেজ প্রথমে বিশ্লেষণ করে এরপর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দ্রুততা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভুল শনাক্তকরণ, তথ্যের নির্ভুলতা এবং নাগরিকের ন্যায়সংগত অধিকার রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যানজটের বড় কারণ অনিয়ন্ত্রিত বাস চলাচল
ডিএমপির ট্রাফিক শাখার মতে, ঢাকার যানজটের অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে নির্ধারিত বাসস্টপেজে গণপরিবহনের না থামা। যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য বাসগুলো অনেক সময় যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যায়। এতে পেছনে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
ডিএমপি বলছে, দৈনিক চুক্তিভিত্তিক অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থার কারণে অনেক বাসচালক ও শ্রমিকের মধ্যে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এই প্রতিযোগিতা বাসগুলোকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যাত্রী ওঠানো-নামাতে উৎসাহিত করে।
এ কারণে শুধু মামলা বা প্রযুক্তি দিয়ে ঢাকার যানজট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ই-টিকিটিং এবং বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এআই ক্যামেরার পর এবার ড্রোন
ডিএমপি ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন ট্রাফিক সিগন্যালকে এআই প্রযুক্তির আওতায় আনার কাজ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, শাহবাগ থেকে শুরু করে ১৪টি এবং লেক রোডে একটি—মোট ১৫টি সিগন্যাল এআই প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। ডিএমপির নিজস্ব সংবাদমাধ্যমেও লেক রোডে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক মামলা ও যানবাহন মনিটরিং কার্যক্রম চালুর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে গত ২০ ও ২১ আগস্ট রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ২ হাজার ৫৫০টি মামলা করেছে। একই অভিযানে ৮৬৫টি গাড়ি ডাম্পিং এবং ৪৯৮টি গাড়ি রেকার করা হয়েছে।
ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত অভিযান, এআই ক্যামেরা এবং সম্ভাব্য ড্রোন প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে ডিএমপি।
এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে
ড্রোন ব্যবস্থাটি এখনো চূড়ান্তভাবে চালু হয়নি। একটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে ডিএমপিকে একটি ড্রোন দিয়েছে এবং সেটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করার আগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অবকাঠামো ও সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাই করা হবে।
রিয়েল টাইম তথ্য পেতে ইন্টারনেট ও সার্ভারভিত্তিক অবকাঠামো প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ শুধু ড্রোন কিনলেই পুরো ব্যবস্থা কার্যকর হবে না; এর সঙ্গে প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, ডেটা সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং কমান্ড সেন্টারভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।
ড্রোন পরিচালনায় প্রশিক্ষণ শুরু
ডিএমপি ইতোমধ্যে সদস্যদের ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। প্রথম ধাপে তেজগাঁও বিভাগের একটি দল প্রশিক্ষণ নিয়েছে। পরবর্তী ধাপে উত্তরা বিভাগের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রযুক্তি নয়, লক্ষ্য সড়কশৃঙ্খলা
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বেশি মামলা করাই পুলিশের লক্ষ্য নয়; বরং মানুষকে ট্রাফিক আইন মানতে অভ্যস্ত করাই মূল উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, বেশি মামলা হওয়া বরং বেশি আইন লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ড্রোন সার্ভিলেন্সকে কেবল মামলা আদায়ের প্রযুক্তি হিসেবে দেখলে উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। বরং এটি যদি যানজটের কারণ শনাক্ত, দ্রুত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, চালকদের সতর্কীকরণ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহৃত হয়, তাহলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
আদালত বার্তার বিশ্লেষণ
ঢাকার যানজট একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গণপরিবহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, সিগন্যাল অমান্য, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতা।
তাই ড্রোন, এআই ক্যামেরা বা এএনপিআর—কোনো একক প্রযুক্তিই ঢাকার যানজটের স্থায়ী সমাধান নয়। তবে এসব প্রযুক্তিকে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ই-টিকিটিং, বাস রুট রেশনালাইজেশন, নির্দিষ্ট বাসস্টপেজ এবং শক্তিশালী গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
একই সঙ্গে ড্রোনের মাধ্যমে সংগৃহীত ভিডিও ও নম্বর প্লেটের তথ্য ব্যবহারে তথ্য নিরাপত্তা, নাগরিকের গোপনীয়তা, ভুল শনাক্তকরণ এবং মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে মানবিক যাচাই নিশ্চিত করা জরুরি।
সবকিছু ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আকাশপথের এই নতুন নজরদারি ব্যবস্থা শুধু যানজট শনাক্ত করবে না—বরং রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে ধীরে ধীরে প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা থেকে তথ্যনির্ভর ও পূর্বাভাসভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের পথও তৈরি করতে পারে।
সূত্র: বাসস ও ডিএমপি-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।