রংপুর আইনজীবী সমিতিতে ভোটাধিকার ও ‘কালাকানুন’ বাতিলের দাবিতে দিনভর উত্তেজনা: সন্ধ্যায় সমঝোতা
নিজস্ব প্রতিবেদক, আদালত বার্তা | রংপুর |
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভোটাধিকার হরণসহ আইনজীবী সমিতির বিভিন্ন ‘কালাকানুন’ বাতিলের দাবিতে নতুন আইনজীবীদের আন্দোলন ঘিরে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দিনভর উত্তপ্ত ছিল রংপুর আদালত চত্বর। সদস্যপদে অতিরিক্ত ফি আদায় ও ভোটাধিকার না দেওয়ার মুচলেকা বাতিলের দাবিতে হওয়া এই আন্দোলনে বিক্ষোভ, হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এ সময় এক সাংবাদিককে মারধর করে তার ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ারও অভিযোগ ওঠে।
অবশেষে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় নতুন আইনজীবীদের দাবির আংশিক মেনে নেয় রংপুর আইনজীবী সমিতি। এরপর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভর্তি কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ভর্তি কার্যক্রম চলবে বলে জানিয়েছে সমিতি।
আন্দোলনের সূত্রপাত ও ভর্তি কার্যক্রমে টানাপোড়েন
মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে রংপুর আদালত চত্বরে বিক্ষোভ শুরু করেন নতুন আইনজীবীরা। তাদের মূল অভিযোগ ছিল— সমিতিতে সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত ফি আদায় করা হচ্ছে এবং ভোটার না হওয়ার শর্তে মুচলেকা নেওয়া হচ্ছে।
বেলা ১টার দিকে আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন আন্দোলনের মুখে অতিরিক্ত ফি ও মুচলেকা ছাড়াই নতুন আইনজীবীদের ভর্তির নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে বেলা ৩টার পর। অভিযোগ ওঠে, সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব আদালত চত্বরে এসে সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশ বাতিল করে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এর পরপরই নতুন আইনজীবীরা পুনরায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাদের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরাও যোগ দিয়ে সমিতিকে ‘আওয়ামী লীগের দালালমুক্ত’ করার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন এবং একপর্যায়ে সভাপতির চেম্বার ঘিরে ফেলেন।
নারী আইনজীবীর ওপর হামলা ও সংঘর্ষ
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকেলে আদালত চত্বরে উপস্থিত হন রংপুর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামুসহ সিনিয়র নেতারা। তারা নতুন আইনজীবী জেবুন্নেসা জেবুর মাধ্যমে সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে খবর পাঠান।
জেবুন্নেসা কার্যনির্বাহী সদস্য সিধাংশুকে বিষয়টি জানাতে গেলে তিনি উত্তেজিত হয়ে তাকে ধাক্কা দেন এবং মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। জেবুন্নেসা অভিযোগ করে বলেন, "সিধাংশু আমাকে পা দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। বিপুল ভাই না বাঁচালে আমি হয়তো মরেই যেতাম।"
এ ঘটনার পর ক্ষুব্ধ নতুন আইনজীবীরা সিধাংশুকে ধাওয়া করে মারধর করেন। পুরোনো আইনজীবীরা এর প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। এর মধ্যেই মহানগর যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও মিছিল নিয়ে আদালত চত্বরে প্রবেশ করেন।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও অভিযোগ
- জেবুন্নেসা জেবু (হামলার শিকার আইনজীবী): “আমরা কেন ভোটাধিকার হরণের মুচলেকা দেব? আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। বিএনপি সরকারের আমলেও যোগসাজশের মাধ্যমে সমিতির সভাপতি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে আমাদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন।”
- শফি কামাল (সদস্যসচিব, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম): “দীর্ঘ ১৭ বছর মানুষ ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলন করেছে, আর সমিতিতে সেই ভোটাধিকার হরণ করা হচ্ছে। নতুন আইনজীবীদের কাছ থেকে পাঁচ-ছয় লাখ বা তারও বেশি টাকা নিয়ে সদস্য করা হচ্ছে, অথচ ভোটাধিকার দেওয়া হচ্ছে না।”
- আফতাফ হোসেন (সাধারণ সম্পাদক, রংপুর আইনজীবী সমিতি): “নতুনদের আন্দোলনের মুখে আমি মুচলেকা ছাড়াই ভর্তির নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু উল্টো আমি সভাপতিসহ অন্যান্যদের মবের শিকার হই।”
- শাহেদ কামাল ইবনে খতিব (সভাপতি, রংপুর আইনজীবী সমিতি): সাধারণ সম্পাদকের ওপর চাপ প্রয়োগ বা নতুন আইনজীবীকে ধাক্কা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, আপনারা তদন্ত করে দেখুন।”
অবশেষে সমঝোতা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সন্ধ্যায় মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, ভোটাধিকার সংক্রান্ত কোনো মুচলেকা নেওয়া হবে না, তবে নতুন আইনজীবীদের নির্ধারিত ফির চেয়ে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ফি দিয়ে সদস্যপদ নিতে হবে।
এই সমঝোতার পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভর্তি কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে রংপুরে মোট ১০৮ জন নতুন আইনজীবী লাইসেন্স পেয়েছেন, যাদের ভর্তি প্রক্রিয়া ঘিরেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত।