রেকর্ড অব রাইট (খতিয়ান) ও মালিকানা স্বত্ব: হাই কোর্টের যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত
এডভোকে মোহাম্মদ এনামুল হক আদালত বার্তাঃ ২২ মে ২০২৬
বাংলাদেশে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ একটি বহুল প্রচলিত বাস্তবতা। বিশেষ করে “খতিয়ান” বা “নামজারি”কে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, খতিয়ানে নাম থাকা মানেই জমির চূড়ান্ত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগ সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এই ধারণার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
মামলার প্রেক্ষাপট
কামাল মিয়া বনাম লাক্কাতুরা টি কোম্পানি লিমিটেড [11 SCOB (2019) HCD 109] মামলায় আদালত খতিয়ান ও মালিকানা স্বত্বের সম্পর্ক নিয়ে যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন, যা ভবিষ্যতে জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
খতিয়ান: মালিকানার প্রমাণ নয়, কেবল অনুমান
হাই কোর্ট স্পষ্টভাবে বলেন, Record of Right (ROR) বা খতিয়ান কোনো জমির মালিকানা (Title) সৃষ্টি করে না। এটি কেবল একটি প্রাথমিক ধারণা (Presumptive Value) প্রদান করে যে, যার নামে খতিয়ান প্রস্তুত হয়েছে তিনি সম্ভবত দখলদার বা স্বত্বাধিকারী।
অর্থাৎ, খতিয়ান এককভাবে মালিকানার চূড়ান্ত দলিল নয়; বরং এটি সহায়ক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত।
এই অনুমান খণ্ডনযোগ্য
আদালত আরও উল্লেখ করেন, খতিয়ানের মাধ্যমে যে মালিকানার ধারণা তৈরি হয়, তা চূড়ান্ত বা অকাট্য নয়। যদি কোনো পক্ষ শক্তিশালী সাক্ষ্য-প্রমাণ (Cogent Evidence) উপস্থাপন করতে পারে—যেমন রেজিস্ট্রিকৃত দলিল, স্বত্বের ধারাবাহিকতা, দখলের প্রমাণ—তাহলে খতিয়ানের এই অনুমান আইনগতভাবে খণ্ডন করা সম্ভব।
আইনগত প্রতিকারের সুযোগ উন্মুক্ত
যদি ভুলবশত কারো নাম খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত না হয়, তবে তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন না। আদালত বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আদালতের শরণাপন্ন হয়ে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।
এক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইন বা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের কিছু ধারা (যেমন Section 52A বা 53C) দেখিয়ে কোনো ন্যায্য দাবি দমন করা যাবে না—এমন অবস্থানও আদালত গ্রহণ করেন।
মামলা খারিজে আদালতের সতর্কতা
দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারার (Inherent Power) অপব্যবহার নিয়েও আদালত সতর্কতা জারি করেন। আদালত বলেন, শুধুমাত্র প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো মামলাকে খারিজ করা উচিত নয়, যদি বাদীর দাবির পেছনে ন্যূনতম যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি থাকে। বরং পূর্ণাঙ্গ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা উচিত।
সাব-রেজিস্ট্রারের ভূমিকা
আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, যখন কোনো সাব-রেজিস্ট্রার একটি দলিল রেজিস্ট্রেশন করেন, তখন ধরে নেওয়া হয় যে তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করেই তা করেছেন। ফলে শুধুমাত্র খতিয়ানে নাম নেই—এই অজুহাতে কোনো বৈধ মালিকানার দাবি বাতিল করা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
এই রায়ের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়েছে—
শুধুমাত্র খতিয়ান বা নামজারির ওপর নির্ভর করে জমির মালিকানা দাবি করা যথেষ্ট নয়। প্রকৃত মালিকানা প্রমাণের জন্য প্রয়োজন:
রেজিস্ট্রিকৃত দলিল
স্বত্বের ধারাবাহিকতা (Chain of Title)
দখলের বাস্তব প্রমাণ
অন্যান্য সহায়ক দলিলাদি
হাই কোর্টের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত জমি সংক্রান্ত বিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। এটি যেমন খতিয়ান সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করবে, তেমনি প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে দলিলভিত্তিক প্রমাণের গুরুত্বও পুনর্ব্যক্ত করবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে জমি সংক্রান্ত মামলাগুলোতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।