শৈশবের আয়নায় মানুষ
এডভোকেট মোহাম্মদ এনামুল হক, আদালত বার্তাঃ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আমরা কি সারাজীবন নিজের অতীতকেই পুনর্নির্মাণ করি?
“মানুষ শৈশবে যা দেখে, সারাজীবন সেটাকে পুনঃনির্মাণ করার চেষ্টা করে।”
কথাটি শুনতে হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়—মানুষের ব্যক্তিত্ব, সম্পর্ক, ভালোবাসা, ভয়, আত্মবিশ্বাস, এমনকি অনেক সিদ্ধান্তের পেছনেও শৈশবের দীর্ঘ ছায়া কাজ করে।
একটি শিশু যখন পৃথিবীকে চিনতে শেখে, তখন সে শুধু অক্ষর বা শব্দ শেখে না; সে শেখে—মানুষকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে রাগ করতে হয়, কীভাবে কষ্ট লুকাতে হয়, কীভাবে ক্ষমা চাইতে হয়, কখন কথা বলতে হয় এবং কখন নীরব থাকতে হয়। সে তার চারপাশের মানুষদের দেখে পৃথিবী সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে।
বাবা-মা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন, সন্তানকে কীভাবে শাসন করেন, ভুল করলে কী প্রতিক্রিয়া দেখান, ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ করেন—এসবই ধীরে ধীরে শিশুর মনে সম্পর্ক ও জীবনের একটি অদৃশ্য মানচিত্র এঁকে দেয়।
বড় হয়ে মানুষ অনেক সময় সেই মানচিত্র নিয়েই জীবনের পথে হাঁটে।
শৈশব—মনের প্রথম বিদ্যালয়
মানুষের মস্তিষ্ক শৈশবে অত্যন্ত দ্রুত বিকশিত হয়। জীবনের প্রথম কয়েক বছর পরিবেশ, অভিজ্ঞতা ও সম্পর্ক থেকে পাওয়া সংকেত মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুর চারপাশের নিরাপত্তা, ভালোবাসা, ভাষা, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং চাপ—সবকিছু তার শেখার ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি গঠনে ভূমিকা রাখে।
তাই একটি শিশু যদি বারবার দেখে—ভুল করলে অপমান, কথা বললে ধমক, কাঁদলে অবহেলা—তাহলে তার কাছে পৃথিবীর স্বাভাবিক চেহারাটাই হয়তো এমন মনে হতে পারে।
আবার যে শিশু দেখে—ভুল করলে বোঝানো হয়, কষ্ট পেলে পাশে কেউ থাকে, নিজের কথা বলার সুযোগ আছে—তার কাছে পৃথিবী সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাটিও ভিন্ন হতে পারে।
এ কারণেই শৈশব শুধু জীবনের একটি সময় নয়; এটি জীবনের পরবর্তী অধ্যায়গুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ভিত্তি।
পরিচিত জিনিসকেই কি আমরা বারবার খুঁজি?
মানুষের মন অদ্ভুতভাবে পরিচিত অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে যেতে পারে। মনোবিজ্ঞানে অতীতের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির প্রবণতা নিয়ে “repetition compulsion” ধারণাটি আলোচিত হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক মানুষ সচেতনভাবে তার শৈশবকে পুনরাবৃত্তি করতে চায়। বরং অনেক সময় পরিচিত আচরণ ও সম্পর্কের ধরন আমাদের কাছে অজান্তেই স্বাভাবিক বলে মনে হয়।
যে মানুষ শৈশবে সবসময় সমালোচনার মধ্যে বড় হয়েছে, সে হয়তো বড় হয়ে এমন সম্পর্কের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে যেখানে তাকে বারবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়।
যে শিশু সবসময় ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অন্যকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছে, সে বড় হয়েও হয়তো “না” বলতে অস্বস্তি বোধ করবে।
আর যে শিশু ঘরে প্রতিনিয়ত ঝগড়া দেখেছে, সে হয়তো শান্ত সম্পর্ককেও কখনো কখনো অচেনা বা অস্বস্তিকর বলে অনুভব করতে পারে।
অর্থাৎ মানুষ সবসময় সুখের সন্ধান করে না—অনেক সময় সে পরিচিত অনুভূতির সন্ধান করে।
সম্পর্কের প্রথম পাঠ: পরিবার
শিশুর প্রথম সম্পর্ক হলো তার পরিবার। সেখান থেকেই সে শেখে—বিশ্বাস কী, নিরাপত্তা কী, ভালোবাসা কী এবং প্রত্যাখ্যান কাকে বলে।
Attachment theory বা সংযুক্তি তত্ত্বের আলোচনায় শিশুর প্রাথমিক যত্নদাতার সঙ্গে সম্পর্ককে পরবর্তী সামাজিক ও আবেগীয় সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যে শিশু তার প্রয়োজনের সময় সাড়া, নিরাপত্তা ও যত্ন পায়, তার মধ্যে নিরাপদ সম্পর্কের ধারণা গড়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে অনিশ্চিত, অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা কঠোর পরিবেশ শিশুর আবেগীয় প্রতিক্রিয়া ও সম্পর্কের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে—শৈশব আমাদের প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎকে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে না।
মানুষ পরিবর্তনশীল।
একটি ছোট সমালোচনা, আর ফিরে আসে বহু বছরের পুরোনো ভয়
ধরা যাক, একজন মানুষ ছোটবেলায় এমন পরিবারে বড় হয়েছে যেখানে সামান্য ভুলের জন্যও তাকে বলা হতো—“তুমি কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারো না।”
বছর কেটে গেছে। সে এখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। কর্মক্ষেত্রে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একটি সাধারণ ভুল ধরিয়ে দিলেন।
কথাটি হয়তো নিছক পেশাগত পরামর্শ।
কিন্তু তার ভেতরে হঠাৎ অস্বস্তি তৈরি হলো। বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল। মনে হলো, আবার যেন সেই ছোট্ট শিশুটিকে বলা হচ্ছে—“তুমি অযোগ্য।”
এখানে বর্তমান ঘটনা যতটা বড় নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া অতীতের আবেগটি হয়তো তার কাছে অনেক বড় হয়ে ওঠে।
এটাই একটি trigger—বর্তমানের কোনো ঘটনা, শব্দ বা আচরণ যা অতীতের গভীর অনুভূতিকে সক্রিয় করে দিতে পারে।
চক্রটি ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ হলো এই পার্থক্যটি বুঝতে শেখা:
“এটি আমার অতীত নয়। এটি বর্তমান।”
বর্তমানের মানুষটি হয়তো সেই পুরোনো মানুষ নয়। বর্তমান পরিস্থিতিও হয়তো অতীতের মতো নয়।
“না” বলতে না পারার পেছনেও থাকতে পারে শৈশব
শৈশবের আরেকটি অদৃশ্য শিক্ষা হলো—নিজের প্রয়োজনকে কতটা গুরুত্ব দিতে হবে।
যে শিশু সবসময় শিখেছে, “বড়দের কথা মানতে হবে”, “অন্যকে কষ্ট দেওয়া যাবে না”, “নিজের কথা বললে সমস্যা হবে”—সে বড় হয়ে অনেক সময় people-pleasing আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
বন্ধু মাঝরাতে ফোন করেছে—ঘুম নষ্ট হলেও কথা বলতে হবে।
কেউ বারবার টাকা ধার চাইছে—নিজের প্রয়োজন থাকলেও না বলা যাবে না।
কেউ অসম্মানজনক আচরণ করছে—সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে প্রতিবাদ করা যাবে না।
তারপর একসময় ভেতরে জমে যায় ক্লান্তি, ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
এখানে প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর সীমানা বা boundary।
সীমানা মানে মানুষকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়। সীমানা মানে অন্যকে অসম্মান না করে নিজের প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতাকেও সম্মান করা।
বন্ধুকে বলা যেতে পারে—
“আমি বুঝতে পারছি তুমি কষ্টে আছো। কিন্তু এখন আমার বিশ্রাম প্রয়োজন। আমরা আগামীকাল কথা বলি।”
আত্মীয়কে বলা যেতে পারে—
“আমি দুঃখিত, এই মুহূর্তে আর্থিকভাবে সাহায্য করার মতো অবস্থায় আমি নেই।”
এই কথাগুলো নিষ্ঠুরতা নয়। বরং নিজের প্রতি দায়িত্বশীলতার প্রকাশ।
নিজের ভেতরের শিশুটির প্রতি একটু সদয় হওয়া
“Inner child” বা অন্তর্নিহিত শিশুসত্তা একটি জনপ্রিয় মনস্তাত্ত্বিক ধারণা। সহজ ভাষায়, এর মাধ্যমে মানুষের শৈশবের অপূর্ণ আবেগ, ভয়, চাহিদা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সচেতনভাবে কাজ করার কথা বোঝানো হয়।
আমরা বড় হয়ে অন্যদের অনেক সহজে ক্ষমা করে দিই, কিন্তু নিজের ছোটবেলার ভুলগুলোর জন্য নিজেদেরই কঠোরভাবে বিচার করি।
কখনো হয়তো নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—
“আমি ছোটবেলায় যে মানুষটি ছিলাম, সে যদি আজ আমার সামনে দাঁড়াত, আমি কি তাকে দোষ দিতাম, নাকি তার মাথায় হাত রেখে বলতাম—‘তুমি যতটা পারতে, ততটাই চেষ্টা করেছিলে’?”
নিজের প্রতি এই সহানুভূতি অনেক সময় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।
অতীতকে অস্বীকার নয়, বুঝতে শেখা
শৈশবের কষ্ট থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ অতীতকে মুছে ফেলা নয়।
বরং অতীতকে এমনভাবে বোঝা, যাতে সেটি বর্তমানের চালক না হয়ে জীবনের একটি অধ্যায় হয়ে থাকে।
নিজেকে কিছু প্রশ্ন করা যেতে পারে—
আমি কেন একই ধরনের সম্পর্কে বারবার জড়িয়ে পড়ি?
কোন আচরণ আমাকে অস্বাভাবিকভাবে রাগিয়ে দেয় বা ভয় পাইয়ে দেয়?
আমি কেন “না” বলতে এত অপরাধবোধ করি?
সমালোচনা শুনলে কেন মনে হয় আমি একজন খারাপ বা অযোগ্য মানুষ?
আমার বর্তমান প্রতিক্রিয়াটি কি সত্যিই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য, নাকি অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা তাকে আরও তীব্র করে তুলছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ নিজের অজান্তে তৈরি হওয়া মানসিক প্যাটার্নগুলো চিনতে শুরু করতে পারে।
চক্র ভাঙা সম্ভব
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো—মানুষ তার শৈশবের অভিজ্ঞতার বন্দি নয়।
মস্তিষ্ক ও আচরণ পরিবর্তনশীল। নতুন অভিজ্ঞতা, নিরাপদ সম্পর্ক, আত্মসচেতনতা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার মানসিক সহায়তার মাধ্যমে মানুষ পুরোনো আচরণগত ও আবেগীয় ধারা পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে।
কখনো নিজে নিজে সচেতন অনুশীলন যথেষ্ট হতে পারে। আবার গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক কষ্ট থাকলে প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। বিভিন্ন ধরনের থেরাপি—যেমন CBT—নেতিবাচক চিন্তার ধরন ও আচরণ নিয়ে কাজ করতে ব্যবহৃত হয়।
পরিবর্তন অবশ্য একদিনে আসে না।
একদিন আপনি ট্রিগার চিনতে পারবেন।
আরেকদিন হয়তো সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কয়েক মুহূর্ত থামতে পারবেন।
তারপর একদিন এমন একটি পরিস্থিতিতে, যেখানে আগে আপনি ভেঙে পড়তেন, সেখানে শান্তভাবে বলতে পারবেন—
“আমি বুঝতে পারছি তুমি কী বলছ। কিন্তু এই কথাটি আমার কাছে কঠিন লাগছে। একটু সময় নিয়ে তারপর কথা বলি।”
সেদিন হয়তো আপনি বুঝবেন—চক্রটি একটু একটু করে বদলাচ্ছে।
শেষ কথা: শৈশব আমাদের শুরু, আমাদের শেষ নয়
আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো শৈশবের গল্প নিয়ে বড় হই।
কারও গল্পে থাকে নিরাপদ আশ্রয়, কারও গল্পে থাকে নিঃসঙ্গতা। কারও শৈশব ভালোবাসায় ভরা, কারওটা অভাব, ভয় কিংবা অবহেলায় চিহ্নিত।
কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—সে শুধু অতীতের ফল নয়; সে নিজের ভবিষ্যতের নির্মাতাও হতে পারে।
শৈশব আমাদের শেখাতে পারে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, আবার কখনো ভুলভাবেও শেখাতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক জীবন আমাদের সেই শিক্ষাগুলোকে পুনরায় পরীক্ষা করার সুযোগ দেয়।
তাই জীবনের কোনো এক পর্যায়ে আমাদের থামতে হয়।
নিজেকে দেখতে হয়।
প্রশ্ন করতে হয়—
“আমি কি সত্যিই আমার জীবন বেছে নিচ্ছি, নাকি শুধু আমার পরিচিত অতীতটাকেই আবার তৈরি করছি?”
যেদিন মানুষ এই প্রশ্নটি করতে শেখে, সেদিন থেকেই পরিবর্তনের দরজা খুলতে শুরু করে।
কারণ অতীত আমাদের গল্পের প্রথম অধ্যায় হতে পারে—
কিন্তু শেষ অধ্যায়টি আমাদেরই লিখতে হয়।