
সংস্কৃতি কি নিরপেক্ষ থাকতে পারে—নাকি অনিবার্যভাবে মতাদর্শের বাহন?
বিশেষ প্রতিবেদন,আদালত বার্তাঃ২০ জুলাই ২০২৬
সংস্কৃতি কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক অ্যান্থনি গিডেন্স ও রেমন্ড উইলিয়ামসের মতে, সংস্কৃতি হলো সমাজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ক্ষমতা কাঠামোর প্রতিফলন। গ্রামসির “সাংস্কৃতিক আধিপত্য” (Cultural Hegemony) ধারণা বলে, শাসক শ্রেণি সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজেদের মতাদর্শকে স্বাভাবিক করে তোলে।
অন্যদিকে, উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি (যেমন ম্যাথিউ আর্নল্ড) সংস্কৃতিকে “সেরা যা চিন্তা ও বলা হয়েছে” হিসেবে দেখে, যা মানবিক মূল্যবোধের উৎস। তবে ফুকোর মতো চিন্তাবিদরা বলেন, জ্ঞান ও সংস্কৃতি ক্ষমতার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
বাস্তবে, সিনেমা, সাহিত্য, শিল্প ও শিক্ষা সবই মতাদর্শ প্রচার করে—কখনো সচেতনভাবে, কখনো অচেতনভাবে। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের চলচ্চিত্র পর্যন্ত এই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট।
প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ, কিন্তু বাস্তবে এটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। সংস্কৃতি কখনোই সম্পূর্ণ শূন্যে জন্ম নেয় না; এটি গড়ে ওঠে সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানুষের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। তাই “সংস্কৃতি নিরপেক্ষ কি না”—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের গভীরতর কয়েকটি স্তরে বিশ্লেষণ করতে হবে।
সংস্কৃতির স্বভাব: নিরপেক্ষতার ভ্রান্ত ধারণা
সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি—ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প, আচার, বিশ্বাস, জীবনযাপন পদ্ধতি। এগুলো সবই মানুষের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
ফলে সংস্কৃতি কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে পারে না।
কারণ—
যে সমাজে বৈষম্য আছে, সেই সমাজের সংস্কৃতিতেও তার প্রতিফলন থাকবে
যে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রবল, সেই রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক প্রকাশেও সেই ছাপ পড়বে
অর্থাৎ, সংস্কৃতি সবসময়ই কোনো না কোনো “পক্ষ” বহন করে—সেটি প্রকাশ্য হোক বা অপ্রকাশ্য।
ইতিহাসের আলোকে: সংস্কৃতি ও রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় সামাজিক পরিবর্তনগুলোর পেছনে সংস্কৃতির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভাষা আন্দোলনে গান, কবিতা, সাহিত্য ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংস্কৃতি হয়ে উঠেছিল জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ছিল রাজনৈতিক বার্তার বাহক
এখানেই বোঝা যায়—সংস্কৃতি কখনো “নিরপেক্ষ দর্শক” নয়; বরং এটি সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।
সমকালীন বাস্তবতা: সংস্কৃতির রাজনৈতিক ব্যবহার
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতি অনেক সময় তিনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—
ক ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে
রাষ্ট্র বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে নিজেদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
রাষ্ট্রীয় পুরস্কার
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা
নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বয়ান প্রচার
এর মাধ্যমে একটি “গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি” তৈরি করা হয়।
প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে
সংস্কৃতি আবার ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষাও হতে পারে।
বিকল্প শিল্পচর্চা প্রতিবাদী গান, নাটক
সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে শিল্প এটি সংস্কৃতিকে করে তোলে পরিবর্তনের শক্তি।
বিভাজনের ক্ষেত্র হিসেবে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—
সংস্কৃতি এখন অনেক ক্ষেত্রে মতাদর্শিক বিভাজনের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
“কে প্রগতিশীল” বনাম “কে রক্ষণশীল”
“কার সংস্কৃতি আসল” বনাম “কার সংস্কৃতি বিকৃত”
ব্যক্তি নয়, তার পরিচয় দিয়ে বিচার
ফলে সংস্কৃতি আর মিলনের জায়গা না হয়ে, অনেক সময় বিভেদের রেখা তৈরি করছে।
প্রতীকের রাজনীতি: ‘ঘনঘটা’ প্রসঙ্গের প্রাসঙ্গিকতা
“ঘনঘটা” শব্দটি যেমন প্রকৃতিতে ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয়, তেমনি সমাজেও এটি প্রতীকী অর্থ ধারণ করতে পারে। একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন—
কারো কাছে শিল্পচর্চা
কারো কাছে রাজনৈতিক বার্তা
আবার কারো কাছে আসন্ন পরিবর্তনের ইঙ্গিত
অর্থাৎ, একই ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন অর্থ বহন করছে—এটাই বর্তমান বাস্তবতা।
নিরপেক্ষতা বনাম দায়বদ্ধতা
সংস্কৃতি যদি পুরোপুরি নিরপেক্ষ না-ও হতে পারে, তাহলে প্রশ্ন আসে—
সংস্কৃতির দায়িত্ব কী?
একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা হওয়া উচিত—
সমালোচনামূলক (critical)
অন্তর্ভুক্তিমূলক (inclusive)
মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন
অর্থাৎ, সংস্কৃতি পক্ষ নেবে—
কিন্তু সেটি হওয়া উচিত মানবতা, ন্যায়বিচার ও সহাবস্থানের পক্ষে; কোনো সংকীর্ণ বিভাজনের পক্ষে নয়।
বর্তমান সংকট: আস্থার ঘাটতি
আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—মানুষ সংস্কৃতির ভেতরেও “গোপন এজেন্ডা” খুঁজে পাচ্ছে।
এর কারণ—
রাজনৈতিক মেরুকরণ
সামাজিক অবিশ্বাস
তথ্যের অতিরঞ্জন ও বিভ্রান্তি
ফলে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আর নিছক অনুষ্ঠান থাকে না; তা হয়ে ওঠে সন্দেহের কেন্দ্র।
উপসংহার: সহাবস্থানের পথ কোথায়?
সংস্কৃতি কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে না।
কিন্তু সেটি যদি কেবল বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজের জন্য তা বিপজ্জনক।
প্রয়োজন—
মতাদর্শের ভিন্নতা মেনে নেওয়া
সংস্কৃতিকে সংলাপের জায়গা বানানো
ব্যক্তি নয়, কাজ দিয়ে মূল্যায়ন
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নিরপেক্ষতা নয়—
সংস্কৃতি কিসের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে, সেটিই আসল।
এবং সেখানেই নির্ধারিত হবে—
এই “ঘনঘটা” বৃষ্টির আশীর্বাদ, নাকি বিভেদের ঝড়।