সীমান্ত নিরাপত্তায় সক্ষমতা বাড়াচ্ছে সরকার
১,৩১১ কোটি টাকায় আধুনিক হচ্ছে রামু সেনানিবাস
নিউজ ডেস্ক, আদালত বার্তা
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে কক্সবাজারের রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৩১১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি—একনেক। ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত একনেকের সভায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘রামু সেনানিবাসের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।
কৌশলগত গুরুত্বে রামু
কক্সবাজারের রামু দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা। এর এক
দিকে বঙ্গোপসাগর ও কক্সবাজার উপকূল, অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্ত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তৃত অঞ্চল। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক প্রস্তুতি ও দুর্যোগকালীন সহায়তার ক্ষেত্রেও এ অঞ্চলের গুরুত্ব রয়েছে।
রামু সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ম পদাতিক ডিভিশনের অবস্থান রয়েছে। সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় রামুকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
৮ হাজারের বেশি সেনাসদস্যের আবাসন ঘাটতি
একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জানান, বর্তমানে রামু সেনানিবাসে ৮ হাজারের বেশি সেনাসদস্যের পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নেই। নতুন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য এই অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করা।
পরিকল্পনা কমিশন-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় বিপুল পরিমাণ আবাসিক ও অনাবাসিক অবকাঠামো নির্মাণ, পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, টেলিযোগাযোগ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী আবাসিক ভবনের আয়তন প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৮৩ বর্গমিটার এবং অনাবাসিক ভবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৫৮ বর্গমিটার।
এ ছাড়া প্রায় ২৫ কিলোমিটার নিকাশব্যবস্থা, ১১টি নলকূপ, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ও অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম, কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাহাড়ের প্রকৃতি রক্ষার নির্দেশ
রামুর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, নির্মাণকাজে পাহাড় কেটে বা ভূমি সমতল করে নয়, বিদ্যমান ভূমির উচ্চতা ও প্রাকৃতিক ঢালের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবনের নকশা করতে হবে।
এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে একদিকে সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ হবে, অন্যদিকে পাহাড়ি এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি
সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সূত্রে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা, আন্তঃগোষ্ঠী সংঘাত, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র চলাচলের ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।
গত ১২ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সেমিনারে সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের সংগঠন এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত তথ্যে গত এক বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতের ৯৬টি গোলাগুলির ঘটনা এবং এতে অন্তত ১২০ জন নিহতের দাবি করা হয়। তবে এসব তথ্য একটি সেমিনারে উপস্থাপিত দাবি; এগুলোকে সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
ভারতীয় সহায়তার অভিযোগ—নিশ্চিত তথ্য নয়
পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বিদেশি শক্তির সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক বক্তব্যে বাংলাদেশের কয়েকজন সরকারি ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পার্বত্য অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার পেছনে বিদেশি স্বার্থ বা প্ররোচনার অভিযোগ তুলেছেন।
তবে ভারত সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে গোপনে সামরিক সহায়তা করছে—এমন অভিযোগের পক্ষে এই মুহূর্তে প্রকাশ্য ও যাচাইকৃত সরকারি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এ ধরনের দাবিকে সংবাদে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়, বরং অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করাই সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
মিয়ানমার সীমান্তেও বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের অপর পাশে মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে। আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গোলাগুলি, অনুপ্রবেশ, অস্ত্র পাচার এবং জেলেদের আটক করার মতো ঘটনাও সংবাদে এসেছে।
এ বাস্তবতায় কক্সবাজার, বান্দরবান ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা এবং সামরিক-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় জোরদারের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
‘ড্রোন’ ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসঙ্গ
সীমান্তবর্তী সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ফাইবার-অপটিক নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট দাবিটির বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। তাই এ তথ্যকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে প্রকাশ না করে সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন।
আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় অবশ্য ড্রোন, সেন্সর, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে উন্নত টেলিযোগাযোগ সুবিধা যুক্ত হওয়ার বিষয়টি এ দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার সক্ষমতা
রামু সেনানিবাসের উন্নয়নকে কেবল নতুন ভবন নির্মাণের প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর কৌশলগত গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। পর্যাপ্ত আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, পানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ এবং অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো তৈরি হলে একটি বড় সামরিক স্থাপনা পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষ করে কক্সবাজারের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমার সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় রামুর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। তবে সামরিক অবকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিজিবি, পুলিশ, কোস্টগার্ড, প্রশাসন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি।
সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা
১ হাজার ৩১১ কোটি টাকার এই প্রকল্প সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়ের স্বচ্ছতা, মানসম্মত নির্মাণ, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে পাহাড়ি অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, পরিবেশ ও ভূমির ওপর যাতে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ
রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়ন মূলত দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। সীমান্তবর্তী একটি কৌশলগত অঞ্চলে আধুনিক সামরিক অবকাঠামো তৈরি হলে সংকটের সময়ে দ্রুত সেনা মোতায়েন, লজিস্টিক সহায়তা এবং সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
তবে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ, সীমান্ত যোগাযোগ, গোয়েন্দা সক্ষমতা, স্থানীয় জনগণের আস্থা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কার্যকর নীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা কেবল একটি সেনানিবাসের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সমন্বিত বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
রামু সেনানিবাসে ১ হাজার ৩১১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বিনিয়োগকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশ সুরক্ষা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করাই হবে এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি।