
স্বৈরাচার বিতাড়িত হওয়ার পর ‘গুপ্তবাহিনী’ ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করে: তারেক রহমান
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ ২০ জুলাই ২০২৬
ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর মধ্যে ‘মতভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু কোনও বিভেদ নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, “৫ আগস্ট স্বৈরাচার বিতাড়িত হওয়ার পরে একটি গুপ্তবাহিনী ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করে। বিগত আন্দোলনে তাদেরকে কোথাও দেখা যায়নি। অনেকে পালিয়ে ছিল। নির্বাচনের পর এই গুপ্তবাহিনীকে দিশাহারার মতো বক্তব্য রাখতে দেখেছি। এখনও তারা বিভিন্ন রকম বক্তব্য রাখছে।” বিএনপি ও শরিকরা প্রতিটি আন্দোলনে সামনে ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিএনপির শরিক নেতাদের সম্মানে নৈশভোজের আগে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় তিনি এমন মন্তব্য করেন।
তারেক রহমান বলেন, “আমরা একসঙ্গে আছি, ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও একসঙ্গে থাকবো। আমাদের মধ্যে ডিফরেন্স অফ অপিনিয়ন হতে পারে, কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির কোনও কারণ আমাদের মধ্যে আছে বলে আমি মনে করি না। ৩১ দফার মাধ্যমে আমরা একটি জায়গায় একত্রিত হয়েছি। আমাদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য এক।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য এক। আমাদের মধ্যে ভিন্নতা থাকতে পারে যেমন একটি দফা কীভাবে বাস্তবায়ন করবো এই ব্যাপারে আপনার একটা মত থাকতে পারে, আমার একটি মত থাকতে পারে। এখানে হয়তো কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোন বিভেদ নেই। আমাদের মধ্যে যেহেতু কোনও বিভেদ নেই, আমাদেরকে ৩১ দফার আলোকে হোক এবং জুলাই সনাদের আলোকে হোক আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবো।”
‘গুপ্তরা আন্দোলনে ছিল না’
অতীতের আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটু পেছনে যাই— আমরা যখন আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। কারও নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না— যাদেরকে একটি শব্দ ‘গুপ্ত’ ব্যবহার করলেই সাধারণ মানুষও তাদেরকে চেনে। এদেরকে কিন্তু ওই সময়ে আমরা অনেক খুঁজেছি তাদেরকে আমরা পাইনি, আমি পাইনি দূরে থেকে। আপনারা কি কেউ পেয়েছিলেন রাজপথে তাদেরকে? তাদেরকে কিন্তু রাজপথে আমরা দেখিনি।”
বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে দেখেছি যারা পালিয়ে গেছে এই দেশ থেকে তাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে আমরা দেখেছি। রাজপথে দেখিনি, শেষের দিকে কিছু কিছু জায়গায় তাদেরকে দেখেছি। কিন্তু ১৭ বছর বিভিন্ন জায়গায় আমরা তাদেরকে দেখিনি। কাজেই দেশের মানুষ আমাদের ওপরেই আস্থা রেখেছে যে, এরাই দেশকে নিয়ে যেতে পারবে— এটি আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।”
‘ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য আমাদেরকে যেকোনও মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করবো। কারণ জনগণের প্রত্যাশা আমাদের কাছে। জনগণ প্রত্যাশা নিয়ে আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছে। আসুন আগে আমরা দায়িত্বটা পালন করি। তারপর আমরা নিজেদেরকে নিয়ে ভাবি।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘বেশ অনেকদিন পরে আপনাদের সঙ্গে আজকে দেখা হয়েছে। কথাটা বললাম এজন্য যে, স্বাভাবিকভাবেই আমরা একসঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। আমরা অত্যাচারিত হয়েছে, নির্যাতিত হয়েছি। আল্লাহর রহমতে আমরা বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সফল হয়েছি এবং যেই দাবিটি নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছিলাম যে তাদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা সেই অধিকার নিয়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছি। বাংলাদেশের মানুষ তাদের রায় দিয়ে দেশ পরিচালনা করার দায়িত্ব দিয়েছে।”
তারেক রহমান বলেন, “অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একসঙ্গে বসে আমরা ৩১ দফা উপস্থাপন করেছিলাম। আপনাদের নিশ্চয়ই এটাও স্মরণ আছে যে ৩১ দফা— রাষ্ট্র মেরামতের যে দফাগুলো আমরা উপস্থাপন করেছিলাম সেটিকে আমরা সংস্কারই বলি। সেটিকে আমরা রাষ্ট্র মেরামতের দফা বলি। তখন বাংলাদেশের অন্য অনেকগুলো রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে যারা পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি যে সংস্কার নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলেছেন এই মানুষগুলোকে বা এই রাজনৈতিক দলগুলোকে তখন সংস্কারের ‘স’ বলতে দেখিনি। কিন্তু আজকে আমরা এই প্যান্ডেলের নিচে যারা বসে আছি একত্রে আমরা কিন্তু তখন স্বৈরাচারের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে আমরা রাষ্ট্র সংস্কারের দফাগুলো আমরা দিয়েছিলাম।”
তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করি, নির্বাচনে জনগণ ৩১ দফার পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন এই ৩১ দফা শুধু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নয় বরং বাংলাদেশের জনগণের ৩১ দফা হয়ে গেছে। ১২ তারিখের নির্বাচনে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি এবং আমরা সফল হয়েছি।”
তিনি বলেন, “আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন ৫ আগস্ট স্বৈরাচার বিতাড়িত হয়েছিল। স্বৈরাচার বিতাড়িত হওয়ার পরে একটি গুপ্তবাহিনী আগস্টের ৫ তারিখের পরে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করেছিল। আপনাদের পরিষ্কার মনে আছে যে, তারা ১২ তারিখের নির্বাচনে এবং নির্বাচনের আগে কি স্বৈরাচারী কায়দায় ডিজিটাল ওয়েতে তারা কীভাবে তাদের কাজগুলো চালিয়েছিল? কীভাবে তারা চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য। তবে এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য বাংলাদেশের জনগণ যখনই স্বাধীনভাবে তাদের মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে তারা সব সময় দেশের পক্ষে, জনগণের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কখনও ভুল করেনি এবং ঠিক ১২ তারিখের নির্বাচনেও তারা সেটিই করেছে।”
‘অন্তবর্তীকালৗন সরকারের এক উপদেষ্টা কথা’
অন্তবর্তীকালীন সরকারের এক উপদেষ্টার কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি সংগত কারণেই নামটি উচ্চারণ করতে চাই না। কয়েকদিন আগে আমার সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টা সাক্ষাৎ হয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে উনি বলছিলেন যে, তারা যে ১৮ মাসের মতন দেশ পরিচালনা করেছেন, এই ১৮ মাস তারা কত অসহায়ের মতো ছিলেন। উনি (উপদেষ্টা) বলছেন, সরকারের ৬০ শতাংশের ওপরে সেই গুপ্ত বাহিনীর ইনফ্লুয়েন্স ছিল।”
আমরা দেখেছি নির্বাচনের পরে এই গুপ্তবাহিনীকে দিশাহারার মত বক্তব্য রাখতে এবং এখনও তারা বিভিন্ন রকম বক্তব্য রাখছে তারা। আমরা পত্রপত্রিকাতে দেখছি, সোশ্যাল মিডিয়াতে আমরা দেখছি। সেই ব্যক্তির (উপদেষ্টার) বক্তব্য হচ্ছে যে, এরা দিশাহারা হয়ে গেছেন— ১৮ মাস তারা এমনভাবে পুরা জিনিসটাকে ব্যবহার করেছে তাদের পক্ষে। কিন্তু ১২ তারিখে যখন জনগণ তাদের রায় প্রদান করেছে তারপর থেকে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।”
ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬-১৭ বছরের রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত অর্থনীতি, বিধ্বস্ত জ্বালানি বা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তুলে ধরেন এবং তার মোকাবিলার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
‘শরিক নেতাদের প্রতি’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা এতদিন একসঙ্গে ছিলাম। আমরা একসঙ্গেই থাকবো। চলতে গেলে এদিক-ওদিক হতেই পারে। এত সমস্যা ২ কোটি মানুষের দেশ। আপনি দেখেন এই ঢাকা শহর এখন পরিস্কার করতেই সমস্য। যে দিকে তাঁকাবেন ময়লা। কেউ একজন বলেছেন এটা কি ফেয়ারওয়েল ডিনার কিনা? কেন ফেয়ারওয়েল হবে? ফেয়ারওয়েল ডিনার যদি দিতে হয় গুপ্ত-সুপ্তদের বলতে পারি, স্বৈরাচারকে বলতে পারি। কিন্তু আমরা যারা ছিলাম। আমরা ইনশাল্লাহ একসঙ্গে থাকবো।”
‘দুঃখ প্রকাশ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘অনেকদিন বসার সুযোগ হয়নি সেজন্য আজকে এই আয়োজনটি করেছি। আমি জানি, মুরুব্বিরা যা বলেছেন তার সঙ্গে আমি মোটেও দ্বিমত করবো না। তাদের মনে এই কষ্ট আছে— সেগুলো আমি জানি। স্বাভাবিক। বয়সে তারা আমার থেকে বড়— আমি ছোট ভাই হিসেবে বড় ভাইদের সব বিষয় মেনে নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছি।
“আমি শুধু এতটুকুই অনুরোধ করবো, একটু আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ খুব সময় মান্না (মাহমুদুর রহমান মান্না) ভাই তার বক্তব্যে বলেছেন যে, জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আসুন আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি জনগণের প্রত্যাশাটাকে আগে আমরা এড্রেস করি।’’
উল্লেখ্য, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় যমুনার অনুষ্ঠানস্থলে এসে প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজ-খরর নেন। কুশল বিনিয়ম পর্বের পর নেতাদের নিয়ে রাতে খাবার টেবিলে বসেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে জাতৗয় পার্টির জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক সাইফুল হক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম বক্তব্য রাখেন।
শরিক নেতাদের সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সহসভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রমুখ নেতারা ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে শরিক নেতাদের সঙ্গে খাবার নেন এবং তাদের সঙ্গে একটি টেবিলে খাবার খান। টেবিলে আরও ছিলেন নাগরিক ঐক্যের মাহবুবুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু।