৪৫ বছর পলাতক জীবনের পর ধরা পড়়়লেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হত্যায় দণ্ডিত আসামি সাবেক মেজর মো. মোজাফফর হোসেন
নিউজ ডেস্ক আদালত বার্তাঃ১৭: জুলাই ২০২৬
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমানকে হত্যায় সরাসরি অংশ নেন মোজাফফর হোসেন/কোলাজ ছবি
পরিচয় পাল্টেছেন, দেশ বদলেছেন, ছদ্মনামে কাটিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু বদলাতে পারেননি জন্মগত একটি চিহ্ন, নাকের নিচে থাকা একটি তিল। এটিই শেষ পর্যন্ত ভেঙে দেয় ৪৫ বছরের পলাতক জীবনের সব নিরাপত্তা।
এতেই ধরা পড়েন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হত্যায় দণ্ডিত আসামি সাবেক মেজর মো. মোজাফফর হোসেন। রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে গত বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি বিশেষ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি ছিল দীর্ঘ সময়ের গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ ও অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনার ফল।
‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড’
জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সেনাপ্রধান ও বাংলাদেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগমারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেন। এই হত্যাযজ্ঞে সরাসরি অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর মোজাফফর হোসেন ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন ছিলেন অন্যতম। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও মামলাসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, মোজাফফর হোসেনই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর তিনিই চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করে জানান, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড’
জিয়াউর রহমান হত্যায় আটক মেজর মোজাফফরকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর
দুই সূত্রে মাসের পর মাস নজরদারি
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, এই আসামির বিষয়ে তাদের হাতে শুরুতে ছিল মাত্র দুটি তথ্য। প্রথমটি, মোজাফফরের মেয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দ্বিতীয়টি, মোজাফফরের নাকের নিচে রয়েছে একটি বড় কালো তিল।
এই দুটি সূত্রকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় অনুসন্ধান। কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল, যাতায়াত ও সম্ভাব্য আবাসস্থল পর্যবেক্ষণ করেন গোয়েন্দারা। একপর্যায়ে বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসাকে সন্দেহের তালিকায় নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় নীরব নজরদারি। ছদ্মবেশে এলাকার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, বাসাটিতে কারা যাতায়াত করেন, কী ধরনের জীবনযাপন- সবকিছু খতিয়ে দেখা হয়। কিন্তু চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন গোয়েন্দারা
যেভাবে সাজানো হয় অভিযান
বুধবার গভীর রাতে অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। ডিবির একটি দল সাধারণ অতিথির ছদ্মবেশে বাসার দরজায় কড়া নাড়ে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে সামনে আসেন এক বৃদ্ধ। গোয়েন্দারা তার মেয়ের অফিস থেকে আসা কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানতে চান, মেয়ে বাসায় আছেন কি না।
বৃদ্ধ ব্যক্তি পাল্টা জানতে চান, এত রাতে কী কাজ? সেই মুহূর্তেই গোয়েন্দাদের চোখ যায় তার মুখের দিকে। অল্প আলোতেও স্পষ্ট দেখা যায় নাকের নিচের সেই পরিচিত কালো তিল।
অপরাধীরা যতই পরিচয় গোপন করুক, কোথাও না কোথাও একটি সূত্র রেখে যায়। এই অভিযানে সেই সূত্র ছিল একটি জন্মচিহ্ন।- অভিযানে থাকা ডিবির এক কর্মকর্তা
এরপর কৌশলে তাকে প্রশ্ন করা হয়- ‘মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না। আপনি কে?’ বৃদ্ধ ব্যক্তি কোনো সন্দেহ না করেই উত্তর দেন- ‘আমি মোজাফফর। ওর বাবা।’
এটুকুই ছিল প্রয়োজন। মুহূর্তের মধ্যেই বেরিয়ে আসে হাতকড়া। কোনো ধরনের প্রতিরোধের সুযোগ না দিয়েই তাকে গ্রেফতার করে ডিবির দল।
অভিযানে থাকা ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, অপরাধীরা যতই পরিচয় গোপন করুক, কোথাও না কোথাও একটি সূত্র রেখে যায়। এই অভিযানে সেই সূত্র ছিল একটি জন্মচিহ্ন
জিয়াউর রহমানকে গুলি করেন মেজর মোজাফফর, ভারতে ছিলেন আত্মগোপনে
৪৫ বছরের ছদ্মবেশী জীবন
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ঘটনার পরপরই মোজাফফর হোসেন দেশ ছাড়েন। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান এবং সেখানে দীর্ঘ সময় ভিন্ন নামে অবস্থান করেন। তিনি নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে ভুয়া নাম, পরিচয় ও বিভিন্ন জাল কাগজপত্র ব্যবহার করেন। পুরোনো পরিচিতজনদের সঙ্গে প্রায় সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
মোজাফফর হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ছিলেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।- ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম
পরবর্তীতে অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফিরে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় বসবাস শুরু করেন। নিজেকে একজন সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ হিসেবে পরিচয় দিতেন। প্রতিবেশীদের কেউই জানতেন না, তাদের পাশের বাসাতেই বসবাস করছেন দেশের অন্যতম আলোচিত হত্যা মামলার পলাতক আসামি।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়
শেষ পর্যন্ত হার মানলো ছদ্মবেশ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে পালিয়ে থাকা একজন আসামিকে গ্রেফতার করা শুধু একটি অভিযান নয়, বরং ধৈর্য, গোয়েন্দা দক্ষতা ও তথ্য বিশ্লেষণের একটি বড় উদাহরণ।
মোজাফফর হোসেন হয়তো পরিচয় পাল্টাতে পেরেছিলেন, পাল্টাতে পেরেছিলেন জীবনযাপনের ধরনও। কিন্তু জন্মগত একটি চিহ্ন শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনলো আইনের মুখোমুখি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা পলাতক জীবনের সমাপ্তি হলো সেই একটিমাত্র অমোচনীয় চিহ্নের কাছে।
কে এই মেজর মোজাফফর
মোজাফফর হোসেনকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী এবং কিলিং স্কোয়াডের সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হামলার সময় তিনি সরাসরি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি চট্টগ্রামের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত করা
সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর
যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, মোজাফফর হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ছিলেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

আইএসপিআরের ভাষ্য
এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, মোজাফফর হোসেন অবসরপ্রাপ্ত ছিলেন না। ফলে সেনাবাহিনীর প্রচলিত বিধান অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।